
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকাগুলোতে আবারও কৃষি বিপর্যয়ের চিত্র দেখা দিয়েছে। মৌলভীবাজার জেলায় নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গিয়ে ডুবে গেছে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান। এতে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর এবং হাওরের বাইরে ৩৫ হাজার ৪৫ হেক্টর জমি রয়েছে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে হাওরের নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২ হাজার ৪৪২ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা হতে পারে। তিনি আরও জানান, পানিতে ডুবে থাকার কারণে এখনো জেলায় ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরিস্থিতি অত্যন্ত করুণ। অনেকেই বাধ্য হয়ে পানির নিচ থেকে ধান কাটছেন, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। স্থানীয় কৃষক বাবর মিয়া জানান, প্রতি বিঘা জমির ধান কাটতে এখন প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ গত বছর কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার করে অর্ধেক খরচেই ধান কাটা সম্ভব হয়েছিল।
আরেক কৃষক জুনেদ মিয়া বলেন, তিনি ১৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র ২ বিঘা জমির ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি ১৩ বিঘা জমির ধান প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পানির নিচে রয়েছে। এতে ধানের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু উৎপাদন ক্ষতিই নয়, বাজারেও ধানের দাম কমে গেছে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ধানের দাম যেখানে ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে ছিল, এখন তা কমে প্রায় ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে কৃষকেরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না।
কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, শুরুতে তিনি প্রতি মণ ধান ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু এখন একই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০০ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর অঞ্চলে বোরো ধানই কৃষকদের প্রধান ফসল। এই ফসল নষ্ট হলে পুরো বছরের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টানা বৃষ্টি এবং অকাল বন্যা এই অঞ্চলের কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে কাউয়াদীঘি হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের চেষ্টা চলছে। তবে অতিরিক্ত পানি থাকায় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে দ্রুত পানি নিষ্কাশনেও বাধা তৈরি হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে হাওর অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে, টানা বৃষ্টির কারণে মৌলভীবাজারে বোরো ধানের এই ক্ষতি শুধু স্থানীয় কৃষকদের নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।