
ইয়েমেন উপকূলের কাছে আবারও জলদস্যু হামলার ঘটনা ঘটেছে। এবার সোমালি জলদস্যুরা একটি তেলবাহী জাহাজ ছিনতাই করেছে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে এটি তৃতীয় জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ছিনতাই হওয়া জাহাজটির নাম ‘ইউরেকা’, যা টোগোর পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজ। স্থানীয় সূত্র ও ইয়েমেনের কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি জাহাজটিতে উঠে পড়ে এবং সেটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে জাহাজটি এডেন উপসাগর হয়ে সোমালিয়ার জলসীমার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরবর্তীতে সোমালিয়ার কর্তৃপক্ষ জানায়, জাহাজটি তাদের জলসীমায় প্রবেশ করেছে এবং সেটিকে মুক্তিপণের জন্য আটক রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘটনায় সোমালিয়ার গালমুদুগ রাজ্যের বন্দর মন্ত্রণালয়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের কারণে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে এ ধরনের ছিনতাই আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সোমালি জলদস্যুদের সঙ্গে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কিছু পর্যায়ে যোগাযোগ থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ দাবি করেছেন, দুই গোষ্ঠীর মধ্যে তথ্য বা প্রযুক্তিগত সহায়তার সম্পর্ক অতীতে দেখা গেছে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানান, সাম্প্রতিক সংঘাত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপথে অবৈধ কার্যক্রমের প্রবণতা বেড়েছে। মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে জলদস্যুরা বড় অঙ্কের অর্থ আয় করছে, যা তাদের কার্যক্রমকে আরও উৎসাহিত করছে।
সোমালিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই জলদস্যুতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। ২০১০ সালের দিকে এই সমস্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন শত শত জাহাজ আক্রান্ত হয় এবং শিপিং শিল্পে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর যৌথ অভিযান ও ন্যাটো-ইইউ সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। জাহাজগুলোকে উপকূল থেকে দূরে রুট পরিবর্তন করে চলাচল করতে বাধ্য করা হয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা সমুদ্রপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমানে সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও জলদস্যুতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে অনেক উপকূলীয় জনগোষ্ঠী মাছ ধরা কমে যাওয়ায় বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক তিনটি জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জলদস্যুদের কার্যক্রম আবারও সংগঠিত হচ্ছে। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে ‘ইউরেকা’ জাহাজের বর্তমান অবস্থান ও নাবিকদের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। জাহাজটির মালিক প্রতিষ্ঠানও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে আন্তর্জাতিক শিপিং আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।