
জার্মানিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস।
সম্প্রচারমাধ্যম ARD-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের কাছেই পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই। ফলে জার্মানিতে এই উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সম্ভাবনা এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
এই ঘোষণার ফলে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সাময়িকভাবে জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হলো দীর্ঘপাল্লার অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা নির্ভুলভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এটি মূলত সমুদ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং আধুনিক যুদ্ধে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত।
২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জার্মানিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল, ইউরোপ নিজেদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। মের্ৎস স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান বা ইরান যুদ্ধ নিয়ে তার সমালোচনার কোনো সম্পর্ক নেই।
তার ভাষায়, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে জড়িয়ে থাকায় নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার নিয়েই চাপে রয়েছে। ফলে নতুন করে ইউরোপে অস্ত্র মোতায়েনের মতো সিদ্ধান্ত এখন বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে ন্যাটো জোটের সদস্য দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
ইউরোপে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ জটিল। পূর্ব ইউরোপে উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন না হওয়া জার্মানির জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, এটি তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এটি ইউরোপের জন্য আত্মনির্ভর হওয়ার একটি সুযোগও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে মনোযোগ বাড়াতে পারে জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে ইউরোপ কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।