
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেদের জীবন এখন নানা সংকটে জর্জরিত। বছরের বিভিন্ন সময়ে সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, বৈরী আবহাওয়া, বাড়তি খরচ এবং জলদস্যু আতঙ্ক—সব মিলিয়ে তাদের পেশা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পাথরঘাটা উপজেলার জেলেদের দুর্দশা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বছরের দীর্ঘ সময় জেলেদের কর্মহীন থাকতে হয়। এই সময়টাতে অধিকাংশ জেলে ধার-দেনা করে সংসার চালান। পরে মাছ শিকার করে সেই ঋণ শোধ করার চাপ তাদের ওপর থাকে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে গেলেও প্রত্যাশিত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আয় কমে যাচ্ছে, আর ঋণের বোঝা বাড়ছে। জেলেদের অনেকেই বলছেন, কয়েকবার সাগরে গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে।
পাথরঘাটার পদ্মা গ্রামের জেলে মো. নাসির মাঝি জানান, একেকবার সাগরে যেতে জ্বালানি, খাদ্য, পানি ও বরফসহ দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেলে সেই খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, কয়েকবার সাগরে গিয়ে সামান্য আয় হলেও মোট হিসাবে লোকসানই বাড়ছে।
এই সংকট শুধু জেলে নয়, ট্রলার মালিক ও শ্রমিকদেরও প্রভাবিত করছে। একটি ট্রলারে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের আয় নির্ভর করে মাছ বিক্রির ওপর। কিন্তু মাছ কম পাওয়ায় তাদের আয়ের সুযোগও কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক শ্রমিক এখন আর সাগরে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
অন্যদিকে, জেলেদের জন্য আরেকটি বড় আতঙ্ক হলো জলদস্যু। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রায়ই দস্যুদের হামলার শিকার হতে হয় তাদের। অনেক সময় জেলেদের মারধর করা হয়, ট্রলার লুট করা হয়, এমনকি অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
জেলে শ্রমিকদের অভিযোগ, সশস্ত্র দস্যুরা হঠাৎ করে ট্রলারে উঠে হামলা চালায় এবং জেলেদের অপহরণ করে সুন্দরবনের গভীরে নিয়ে যায়। এরপর পরিবারের কাছে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অনেক সময় মুক্তিপণ দিতে না পারলে নির্যাতনের শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীদের।
একজন জেলে শ্রমিক জানান, একজন জেলেকে মুক্ত করতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা, কখনো তারও বেশি টাকা খরচ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এসব কারণে জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং ট্রলারের যন্ত্রাংশ ও মেরামত খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে আয় কমলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জেলেরা আর্থিকভাবে চরম চাপে পড়েছেন।
স্থানীয় জেলে ও ট্রলার মালিকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজের দিকে ঝুঁকবেন। তারা সরকারের কাছে সহজ শর্তে ঋণ, জ্বালানিতে ভর্তুকি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়া সমুদ্রে নিরাপত্তা জোরদার করে জলদস্যু দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। জেলে নেতাদের মতে, জেলেদের জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে হলে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তাদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, উপকূলীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জেলে সম্প্রদায় এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। তাদের সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।