
টানা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে রয়েছে ইরান। বৈশ্বিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা NetBlocks-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে ৬৫তম দিনে প্রবেশ করেছে।
এই তথ্য প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে চলমান এই ইন্টারনেট অচলাবস্থা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জানুয়ারির শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। শুরুতে নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধতা থাকলেও ধীরে ধীরে তা প্রায় সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউটে রূপ নেয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘাত শুরু হয়। এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার অজুহাতে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তথ্য প্রবাহ সীমিত করে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে এর ফলে সাধারণ জনগণ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের এই ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে দেশটির কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে অনলাইননির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার এবং ডিজিটাল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
অনেক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেকেই আয়-রোজগার হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার সেবা এবং অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো খাতগুলো প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় পরিবার-পরিজন ও আন্তর্জাতিক সংযোগ সীমিত হয়ে গেছে। অনলাইন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যাংকিং কার্যক্রমও বিঘ্নিত হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, দীর্ঘমেয়াদি ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা এতে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরান সরকার এই পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি ব্যাখ্যা না দিলেও নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে বিভিন্ন সময়ে।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি দেশের প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকা বিরল ঘটনা। এটি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকেই নয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সব মিলিয়ে, ইরানে চলমান এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংযোগে গভীর সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।