
বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান অস্থিরতার মধ্যে হঠাৎ করেই স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের ধস দেখা গেছে। সাধারণত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে স্বর্ণকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেন এই প্রচলিত ধারণাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
শুক্রবার (১ মে) আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম একদিনেই ১ শতাংশের বেশি কমে যায়। বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা ৫২ মিনিটে স্পট গোল্ডের দাম দাঁড়ায় প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৬৮ দশমিক ৮২ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে জুন মাসের জন্য নির্ধারিত গোল্ড ফিউচারসও কমে গিয়ে ৪ হাজার ৫৭৯ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে আসে।
এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে, যা সরাসরি বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, ফলে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয় বা অন্তত তা বিলম্বিত করতে হয়।
এই সুদের হারই স্বর্ণের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। কারণ স্বর্ণ একটি সুদবিহীন সম্পদ। অর্থাৎ, এটি ধরে রাখলে কোনো সুদ বা নির্দিষ্ট আয় পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বন্ড বা ট্রেজারির মতো সুদবাহী সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং দাম পড়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে চাইছেন, কিন্তু তারা স্বর্ণের বদলে এমন সম্পদ বেছে নিচ্ছেন, যেগুলো থেকে নিয়মিত আয় পাওয়া যায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড এখন অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তবে বিষয়টি পুরোপুরি একপাক্ষিক নয়। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ এখনও একটি শক্তিশালী ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। যখনই বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট বা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন স্বর্ণের চাহিদা আবারও বাড়তে দেখা যায়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা একদিকে স্বর্ণের চাহিদা বাড়াতে পারত, কিন্তু বিপরীতে সুদের হার বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী ডলারের কারণে সেটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। রুপা, প্লাটিনাম এবং প্যালাডিয়ামের দামও কমেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বিনিয়োগকারীরা সামগ্রিকভাবে ধাতব সম্পদ থেকে কিছুটা দূরে সরে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বর্ণের দাম কমলে স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। এতে স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীরা নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে বিয়ের মৌসুম বা অলংকার ক্রয়ের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, স্বর্ণের দামের এই পতন শুধু একটি বাজারগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির গভীরতর পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত। জ্বালানি খাত, সুদের হার এবং বিনিয়োগ প্রবণতার এই পারস্পরিক সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকে এবং সুদের হার কমার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে স্বর্ণের বাজারে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।