
রংপুর বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতি বড় কোনো সমস্যা না হলেও আতঙ্ক, কালোবাজারি এবং বণ্টন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
পেট্রল পাম্প মালিক, ডিপো কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বরাদ্দ ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন না আসায় পাম্পগুলোতে দ্রুত জ্বালানি শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে শহর ও উপজেলা পর্যায়ে আগের মতোই সীমিত বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় কম বলে মনে করছেন অনেক পাম্প মালিক। এর ফলে কাগজে-কলমে বড় কোনো ঘাটতি না থাকলেও বাস্তবে অনেক পাম্পে জ্বালানি না থাকার চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও আংশিকভাবে চালু, আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জ্বালানি পাচ্ছেন না ভোক্তারা।
স্থানীয় পাম্প মালিকদের অভিযোগ, পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয় এবং একটি চক্রের কালোবাজারি কার্যক্রম। তাদের দাবি, একই মোটরসাইকেল বা যানবাহন দিয়ে একাধিক পাম্প থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা পরে খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই কালোবাজারে প্রতি লিটার জ্বালানি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
একজন পাম্প মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একই বাহন দিনে কয়েকটি পাম্প থেকে বারবার তেল সংগ্রহ করছে। এতে স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চাপ তৈরি হচ্ছে, যার ফলে মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক পাম্প নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বলছেন, পাম্পে জ্বালানি না পাওয়া গেলেও বাইরে উচ্চ দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেটি প্রকাশ্যে নয়, বরং গোপনে লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে রংপুর নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক স্থানে “তেল নেই”, “পেট্রল নেই” সাইনবোর্ড ঝুলছে। কিছু পাম্প খোলা থাকলেও সেখানে শুধুমাত্র সীমিত পরিমাণে জ্বালানি বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও আবার ডিজেল আছে কিন্তু পেট্রল বা অকটেন নেই—এমন পরিস্থিতিও দেখা গেছে।
ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহন চালকদের মধ্যে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। অনেক চালক অভিযোগ করেছেন, ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তারা জ্বালানি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
রংপুর বিভাগ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জানান, বিভাগে মোট ৩৮০টি পাম্প রয়েছে। এসব পাম্পের মধ্যে কিছু পাম্প নিয়মিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি পেলেও অনেক পাম্প অনিয়মিত সরবরাহের কারণে দ্রুত মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
পাম্প মালিকদের আরেকটি অভিযোগ হলো, কিছু অসাধু চক্র জ্বালানি সংগ্রহ করে তা অবৈধভাবে মজুদ করছে, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। তাদের মতে, বাস্তবে সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও এই অবৈধ মজুদের কারণে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে রংপুর জেলায় পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের বড় পরিমাণ মজুদ থাকলেও বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার সমস্যার কারণে ভোক্তাদের কাছে তা সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে এবং অ্যাপ-ভিত্তিক জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে একজন ব্যক্তি একই দিনে একাধিকবার জ্বালানি নিতে না পারে।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সংগঠনের নেতারা মনে করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকলেও আতঙ্ক, অব্যবস্থাপনা ও কালোবাজারির কারণে রংপুরে জ্বালানি সংকট একটি জটিল পরিস্থিতিতে রূপ নিয়েছে। দ্রুত কার্যকর নজরদারি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং জনদুর্ভোগ বাড়তে পারে।