
হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ পরিবহন হয়, যার ওপর ভারত ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহন করা হয়। ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ আমদানি করে এবং এর বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে। ফলে এই সরবরাহ রুটে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে তা ভারতের জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের জ্বালানি আমদানির প্রায় অর্ধেক হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। এছাড়া এলপিজি ও এলএনজির বড় অংশও এই পথ ব্যবহার করে ভারত পৌঁছে। ফলে অবরোধ বা সংঘাত দীর্ঘ হলে শুধু তেলের দামই বাড়বে না, বরং গ্যাস, সার এবং শিল্প উৎপাদনেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল ভোক্তা এবং এলপিজি আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। দেশটি দৈনন্দিন জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানি নির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে ভারতের জ্বালানি আমদানি বেশি। এই দেশগুলোর রপ্তানি কার্যক্রম হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। তাই সেখানে সংকট তৈরি হলে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে কাতারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ এবং ভারতের প্রধান সরবরাহকারীও। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বা অবরোধ পরিস্থিতি ভারতের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া সার, রাসায়নিক ও কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বড় অংশও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে এসব পণ্যের পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি আরও বাড়বে। একইসঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত কিছুটা বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা এখনো উল্লেখযোগ্য। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ চেইনে কোনো বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে তা অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির পাশাপাশি ভারতের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।