
দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় এবার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ সম্প্রতি একটি নির্দেশনা জারি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে অভিজ্ঞ ও শারীরিকভাবে সক্ষম অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে উপজেলা ভিত্তিক একটি ‘শিক্ষক পুল’ গঠন করা হবে। এই পুল থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িকভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা হবে।
মন্ত্রণালয়ের মতে, বর্তমানে এনটিআরসিএ (NTRCA)-এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় ভোগে। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর পর্যন্ত পদ খালি থাকে। এই সময় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকদের (DC) নেতৃত্বে উপজেলা পর্যায়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO)-এর পরামর্শে এবং সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে এই শিক্ষকদের সাময়িকভাবে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তাদের সম্মানী প্রদান করা হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দ্রুত শিক্ষক সংকট কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রাখা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেখানে নতুন শিক্ষক নিয়োগে সময় লাগে বেশি, সেখানে এই ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, এটি একটি বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। অভিজ্ঞ শিক্ষকরা দ্রুত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিশ্চিত করতে পারবেন এবং শিক্ষার মান বজায় রাখতে সহায়তা করবেন।
অন্যদিকে, কিছু শিক্ষক নেতা এবং বিশ্লেষকরা এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, সম্মানী কাঠামো, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব এড়ানো না গেলে এই উদ্যোগ সফল নাও হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে এটি বিকল্প সমাধান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
এনটিআরসিএ-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা মনে করেন না যে শিক্ষক সংকট মূল সমস্যা। তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক থাকার পরও নির্দিষ্ট বিষয়ের অভাব দেখা দেয়, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ হাজারেরও বেশি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে বলে সংসদে তথ্য উঠে এসেছে। এই বিশাল ঘাটতির কারণে সরকার বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পুল সেই উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সাময়িক হলেও বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।