
ইসলামে প্রতিটি আমলের মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। একজন মানুষ যা-ই করুক না কেন, তার সেই কাজের মূল্য নির্ধারিত হয় তার অন্তরের উদ্দেশ্যের উপর। বাহ্যিকভাবে বড় বা প্রশংসনীয় কাজ হলেও যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়, তবে সেই আমল পরকালে কোনো উপকারে আসবে না। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে একটি সহিহ হাদিসে, যা আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তির বিচার করা হবে। প্রথম ব্যক্তি একজন শহিদ, যিনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে জীবন দিয়েছেন। তাকে আল্লাহ তার দানকৃত নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেবেন, এবং তিনি তা স্বীকার করবেন। এরপর জিজ্ঞেস করা হবে, তিনি এই নিয়ামত দিয়ে কী আমল করেছেন। তিনি বলবেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ করেছেন এবং শহিদ হয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ বলবেন, তিনি মিথ্যা বলেছেন; বরং তিনি যুদ্ধ করেছেন মানুষের কাছে বীর হিসেবে পরিচিত হওয়ার জন্য। ফলে তার সেই ইচ্ছা দুনিয়াতেই পূরণ হয়েছে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন একজন আলেম ও কোরআন তিলাওয়াতকারী। তিনি ইলম অর্জন করেছেন, অন্যদের শিক্ষা দিয়েছেন এবং কোরআন তিলাওয়াত করেছেন। কিন্তু যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, তখন তিনি বলবেন যে, তিনি সবই করেছেন আল্লাহর জন্য। কিন্তু আল্লাহ জানিয়ে দেবেন, তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে আলেম বা কারি হিসেবে পরিচিত হওয়া। তাই তার আমলও গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তৃতীয় ব্যক্তি হলেন একজন ধনী, যাকে আল্লাহ বিপুল সম্পদ দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর পথে দান করেছেন বলে দাবি করবেন। কিন্তু আল্লাহ জানিয়ে দেবেন, তিনি দান করেছেন মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য, যাতে তাকে দানশীল বলা হয়। ফলে তার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে দুনিয়াতেই, কিন্তু পরকালে তার কোনো প্রতিদান থাকবে না। তাকেও একইভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
এই হাদিসটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। এখানে তিনটি মহান কাজের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে—জিহাদ, ইলম শিক্ষা এবং দান। এই তিনটি কাজ ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। কিন্তু শুধুমাত্র নিয়তের কারণে এই মহান আমলগুলোও গ্রহণযোগ্য হয়নি। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায়, আল্লাহর কাছে আমলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে অন্তরের বিশুদ্ধতার উপর।
নিয়ত বিশুদ্ধ না হলে আমল যত বড়ই হোক না কেন, তা মূল্যহীন হয়ে যায়। ইসলামে এটিকে বলা হয় “রিয়া” বা লোক দেখানো। এটি একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি, যা মানুষের আমলকে নষ্ট করে দেয়। অনেক সময় মানুষ অজান্তেই এমন কাজ করে ফেলে, যেখানে তার উদ্দেশ্য হয় মানুষের প্রশংসা অর্জন করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়।
তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত প্রতিটি কাজের আগে নিজের নিয়ত ঠিক করা। নামাজ, রোজা, দান, শিক্ষা—সবকিছুই যেন শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য হয়। নিজের অন্তরকে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা কেন এই কাজটি করছি? মানুষের প্রশংসার জন্য, না কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য—এই প্রশ্নটি নিজেকে করা দরকার।
এই হাদিস আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, শুধু বাহ্যিক ভালো কাজ যথেষ্ট নয়। বরং অন্তরের খাঁটি নিয়তই হলো আসল। যদি নিয়ত সঠিক থাকে, তবে ছোট আমলও আল্লাহর কাছে বড় হয়ে যায়। আর যদি নিয়ত ভুল হয়, তবে বড় আমলও কোনো মূল্য রাখে না।
সুতরাং, আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজে নিয়তের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি। আল্লাহ যেন আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখেন এবং আমাদের সব আমল তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কবুল করেন—এই দোয়া করা উচিত।