
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এশিয়ার সকালের লেনদেনে তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে Brent crude প্রতি ব্যারেল ২.২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬.৭০ ডলারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক West Texas Intermediate (ডব্লিউটিআই) ২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৬.৯০ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ সরবরাহ শঙ্কা। কারণ বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই যাতায়াত করে। ধারণা করা হয়, প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে অতিক্রম করে। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর কথা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ইরানের নৌবাহিনী ইতোমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথে চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এতে করে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প পথ খুঁজছে বা যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে কিছু দেশ যেমন মালয়েশিয়া, ভারত ও ফিলিপাইন তাদের জাহাজ চলাচলের জন্য বিশেষ সমঝোতায় পৌঁছালেও সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত, এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ চলাচল করছে।
এই পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আজ থেকেই স্বাভাবিক চলাচল শুরু হয়, তাহলেও জমে থাকা জাহাজের জট কাটাতে অন্তত ১০ দিন সময় লাগবে। এই বিলম্ব তেলের সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি করতে পারে, যা দাম আরও বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
বাজার বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায় তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর থাকবে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি নিরাপদ হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা পণ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তেলের দামে ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।