
দেশের একমাত্র ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার কারখানা, ডিএপি ফার্টিলাইজার কম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল), তীব্র গ্যাস সংকট ও কাঁচামাল অ্যামোনিয়ার অভাবে বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) রবিউল আলম খান জানিয়েছেন, বর্তমানে মজুদ কাঁচামাল দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব। এর পর নতুন সরবরাহ না পেলে উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ডিএপি সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো অ্যামোনিয়া, যা সরবরাহ করে মূলত চট্টগ্রামের ‘চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কম্পানি লিমিটেড’ (সিইউএফএল) এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কাফকো। ফসফরিক অ্যাসিড আমদানির মাধ্যমে আসে মরক্কো, জর্ডান, চীন, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে গত ৪ মার্চ থেকে সিইউএফএল ও কাফকো উভয় কারখানাই বন্ধ রয়েছে, ফলে ডিএপিএফসিএল তাদের প্রয়োজনীয় মাসিক ২ হাজার টন অ্যামোনিয়া সংগ্রহ করতে পারছে না।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জানিয়েছে, বর্তমানে রেশনিং পদ্ধতিতে শুধু নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া কারখানাটি চালু রাখা হয়েছে। বাকি সবগুলো কারখানা চলতি মাসজুড়ে বন্ধ থাকতে পারে।
দেশে ডিএপি সারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৩ লাখ ৫৫ হাজার টন, যার বড় অংশ আমদানি করা হয় সৌদি আরব থেকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট ও হরমুজ প্রণালী অবরোধের কারণে আমদানির অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়াও ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী জুন পর্যন্ত সারের মজুদ পর্যাপ্ত থাকলেও জুলাই-আগস্টে আমন মৌসুমে চাহিদা বাড়লে দেশ বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার এই সময়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোই একমাত্র সমাধান। তিনি বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করে সিইউএফএল বা কাফকোর মধ্যে অন্তত একটি কারখানা চালু রাখা জরুরি, না হলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।
ডিএপিএফসিএলের রবিউল আলম খান জানান, কাঁচামাল হিসেবে মাসে দুই হাজার টনের মতো অ্যামোনিয়ার চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে যে মজুদ আছে তা দিয়ে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব। সিইউএফএল ও কাফকো থেকে কোনো একটিও চালু না হলে উৎপাদন বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, গ্যাস সংকট থাকায় নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানাটি ছাড়া বাকি কারখানাগুলো চলতি মাসজুড়ে বন্ধ রাখতেই হবে।
ড. জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, সামনের আউশ ও আমনের মৌসুম এবং শীতকালীন সবজির উৎপাদনকে নিরাপদ রাখতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো অপরিহার্য। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সংক্ষেপে, গ্যাস ও অ্যামোনিয়া সংকটের কারণে দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে থাকায় দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ নিশ্চিত করাই এই সংকট মোকাবেলার একমাত্র উপায়।