
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ Sundarbans-এ শুরু হয়েছে চলতি মৌসুমের মধু আহরণ কার্যক্রম। সরকারি অনুমতিপত্র বা ‘পাস’ নিয়ে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে মৌয়ালরা বনে প্রবেশ করছেন। তবে এবারও এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে নানা শঙ্কা ও ঝুঁকির মধ্য দিয়ে, যার মধ্যে রয়েছে বনদস্যুদের সম্ভাব্য তৎপরতা, বন্যপ্রাণীর আক্রমণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা।
বুধবার (১ এপ্রিল) সকাল থেকে বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দলবদ্ধভাবে বনে প্রবেশ করেন মৌয়ালরা। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই তাদের জন্য ১৪ দিনের পাস ইস্যু করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহ করে ফিরে আসবেন।
মৌয়ালদের কাছে এই সময়টি যেমন জীবিকার অন্যতম প্রধান সুযোগ, তেমনি এটি ঝুঁকিপূর্ণ একটি অধ্যায়ও। প্রতি বছরই তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের গভীরে প্রবেশ করেন। চলতি মৌসুমেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বরং বনদস্যুদের সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় এক মৌয়াল রিপন খান জানান, তারা নিয়ম মেনে ১৪ দিনের পাস নিয়ে বনে ঢুকেছেন এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে মধু সংগ্রহ করবেন। তবে বনদস্যুদের ভয় সবসময় তাদের মনে কাজ করে। তিনি বলেন, নিরাপদে ফিরে আসার জন্য তারা সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অতীতে সুন্দরবন এলাকায় বনদস্যুদের তৎপরতা দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা ছিল। বিভিন্ন সময়ে দস্যু বাহিনী জেলে ও মৌয়ালদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটিয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবুও মাঝেমধ্যে দস্যুদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে বন্যপ্রাণীর ঝুঁকিও কম নয়। সুন্দরবন বিশ্বখ্যাত Royal Bengal Tiger-এর আবাসস্থল হওয়ায় মৌয়ালদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। পাশাপাশি বনে প্রবেশের সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তন কিংবা দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থেকে যায়।
বাগেরহাট জেলা বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানিয়েছেন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি দলকে নিবন্ধনের আওতায় এনে পাস প্রদান করা হয়েছে এবং তারা নির্ধারিত নিয়ম মেনে মধু আহরণ করবেন। পাশাপাশি বনরক্ষীরা সার্বক্ষণিক তদারকিতে থাকবে।
তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। তবুও স্থানীয়দের মতে, বনদস্যু আতঙ্ক পুরোপুরি দূর না হওয়ায় মৌয়ালদের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, এই ঝুঁকি কমাতে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে বনদস্যুদের পুনরুত্থান ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো এবং মৌয়ালদের সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সবকিছু মিলিয়ে, সুন্দরবনে মধু আহরণ কার্যক্রম শুরু হলেও এটি শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রামের এক বাস্তব চিত্র। জীবিকার তাগিদে মৌয়ালরা প্রতি বছরই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ান, আর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।