
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু নীতিগত দুর্বলতাও দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে, যেখানে ডিজেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষি মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের চাহিদা বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ববর্তী সময়ের কিছু চুক্তি এবং ব্যবস্থাপনার কারণে এই সংকট আরও জটিল হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে করা বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিযোগিতা ছাড়াই কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং চুক্তি সম্পাদনের ফলে সরকারের আর্থিক দায় বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন না হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হয়েছে, যা সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের বেশি সময়ে বহু বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে এসব চুক্তির আর্থিক ও আইনগত দিক বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে চুক্তিগুলো যাচাই এবং প্রয়োজনে সংশোধন বা বাতিল করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে কিছু বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব চুক্তিতে শর্তগুলো সবসময় দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে চাহিদা না থাকলেও নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য হওয়ার মতো শর্ত যুক্ত ছিল, যা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পূর্ববর্তী সময়ের সব বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা করা হবে এবং যেগুলো জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি মনে হবে, সেগুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে এ ধরনের চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক চুক্তিতে ক্ষতিপূরণের শর্ত থাকায় তা বাতিল করলে আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এজন্য বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেছেন, একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
এছাড়া কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। যেসব দেশের সঙ্গে এসব চুক্তি করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা প্রয়োজন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় চুক্তিগুলো সংসদীয় বা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করা হয়। একইভাবে বাংলাদেশেও সংসদীয় কমিটি বা বিচারিক কমিশনের মাধ্যমে এসব চুক্তি মূল্যায়নের প্রস্তাব এসেছে।
সবশেষে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিদ্যুৎ খাতের সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। অপচয় কমানো, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়াই হতে পারে এই খাতের স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।