
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার। ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার মনে করেন, এই সমস্যা খাতটির জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তার ভাষায়, খেলাপি ঋণ এমন এক ধরনের সমস্যা, যা ধীরে ধীরে ভেতর থেকে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
তিনি বলেন, সাধারণভাবে অনেকের ধারণা হতে পারে যে ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফা ভালো অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্কের প্রভিশন রাখতে হয়, ফলে প্রকৃত লাভ কমে যায় এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
তার মতে, বর্তমানে সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতে বড় কোনো তারল্য সংকট নেই, যদিও কিছু ব্যাংক নির্দিষ্ট সমস্যার মুখে পড়েছে। তবে প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, যা অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খেলাপি ঋণের হার এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তবুও এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেকটাই উচ্চ।
ইস্টার্ন ব্যাংকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আলী রেজা ইফতেখার বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তারা খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে কম রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, যেমন—সঠিক গ্রাহক নির্বাচন, ঋণ প্রস্তাবের যথাযথ মূল্যায়ন, ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত তদারকি এবং কার্যকর আদায় ব্যবস্থা।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঋণ দেওয়ার পর মনিটরিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যথাযথ নজরদারি না থাকলে ভালো গ্রাহকও সময়ের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতে কেওয়াইসি (Know Your Customer) প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হয়েছে। গ্রাহকের আয়ের উৎস যাচাই এবং লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সরাসরি ঋণ অনুমোদনে জড়িত হলে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার মতে, পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঋণ অনুমোদনই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
এছাড়া ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সম্পদের মূল্যায়ন নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেক সময় জমির মূল্য প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দেখানো হয়, যা ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।
ডলারের হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয় করা হলে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ কম পড়ত। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে।
আগামী সময়কে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পর স্থিতিশীলতা ফিরে পেতে সময় লাগে। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়েও ধীর ও প্রস্তুতিপূর্ণ অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
নতুন প্রজন্মের ব্যাংকারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সফল হতে হলে শুধু স্মার্ট চিন্তা নয়, কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্যের প্রয়োজন। শর্টকাটে স্থায়ী সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।
সবশেষে তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে অনেক দক্ষ ব্যাংকার তৈরি হয়েছে, যারা বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন—যা প্রতিষ্ঠানটির একটি বড় অর্জন।
সর্বোপরি, তিনি মনে করেন সঠিক নীতি, কার্যকর তদারকি এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।