অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম Australian Broadcasting Corporation (এবিসি)-এর কর্মীরা বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ধর্মঘটে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম সংস্থাটির কর্মীরা এমন কর্মসূচিতে যাচ্ছেন, যা দেশটির গণমাধ্যম অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘোষণা অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা থেকে ২৪ ঘণ্টাব্যাপী এই ধর্মঘট শুরু হবে। এর ফলে এবিসির সরাসরি টেলিভিশন ও রেডিও সম্প্রচার ব্যাপকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে লাইভ অনুষ্ঠান ও সংবাদ প্রচারে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবিসি কর্তৃপক্ষ কর্মীদের জন্য তিন বছরে মোট ১০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে প্রথম বছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পরবর্তী দুই বছরে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে এই প্রস্তাব কর্মীদের একটি বড় অংশ সন্তোষজনক মনে করেননি।
প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কর্মীর মধ্যে ৭৫ শতাংশ এই প্রস্তাবের ওপর ভোট দেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। কর্মীদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বেতন বৃদ্ধি পর্যাপ্ত নয়।
বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতির বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, যা প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বাস্তবে কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কর্মীদের ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকেও প্রস্তাবটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের সংগঠন Media Entertainment and Arts Alliance-এর প্রতিনিধি Michael Slezak বলেন, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় যা মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় কম বেতন দেয় এবং সাংবাদিকদের জায়গায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায়।
তিনি আরও জানান, বর্তমান প্রস্তাবে প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ছুটি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো সুস্পষ্ট সমাধান নেই। ফলে কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে Community and Public Sector Union-এর পক্ষ থেকেও সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব না আসে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং আন্দোলন আরও তীব্র হতে পারে।
এদিকে এবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক Hugh Marks জানিয়েছেন, তারা যে প্রস্তাব দিয়েছেন সেটি সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে থেকেই করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সব দিক বিবেচনা করেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাব কর্মীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে বিরোধ মেটাতে সংস্থাটি Fair Work Commission-এর সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হবে।
উল্লেখ্য, এবিসির কর্মীরা সর্বশেষ ২০০৬ সালে ধর্মঘটে গিয়েছিলেন। প্রায় দুই দশক পর আবারও এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বেতন বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, প্রযুক্তির প্রভাব এবং কর্মীদের অধিকার—এই সবকিছুর সমন্বয়ে এবিসির বর্তমান পরিস্থিতি একটি বড় শ্রমিক আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে। এর প্রভাব শুধু সংস্থাটির ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক গণমাধ্যম পরিবেশেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।