
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ধরনের হুমকি বা বাধা ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলে না দিলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এই অবস্থান প্রকাশের মাধ্যমে চলমান সংকটকে আরও তীব্র এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া বার্তায় স্পষ্ট করে জানান, ‘এ মুহূর্ত থেকে’ পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এ বক্তব্যের সঙ্গে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হুমকিও যুক্ত করেছেন। বিশেষ করে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দেওয়ায় বিষয়টি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আপনার দেওয়া সময়তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প জিএমটি সময় ২১ মার্চ রাত ১১টা ৪৪ মিনিটে এই আলটিমেটাম দেন। ৪৮ ঘণ্টা হিসাব করলে তা শেষ হয় ২৩ মার্চ রাত ১১টা ৪৪ মিনিট জিএমটিতে। বাংলাদেশ সময় জিএমটি থেকে ৬ ঘণ্টা এগিয়ে, তাই বাংলাদেশ সময়সীমা দাঁড়ায় ২৪ মার্চ ভোর ৫টা ৪৪ মিনিটে। অন্যদিকে তেহরান সময় জিএমটির তুলনায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা এগিয়ে থাকায়, ইরানের স্থানীয় সময় অনুযায়ী সময়সীমা শেষ হয় ২৪ মার্চ ভোর ৩টা ১৪ মিনিটে। এই সময়-রূপান্তর গাণিতিকভাবে সঠিক।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোর একটি। Reuters জানিয়েছে, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে চলাচল ব্যাহত হওয়া মানে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগা। জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে গেলে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে পারে, সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হতে পারে এবং তেলনির্ভর অর্থনীতিগুলোতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় হরমুজ প্রণালি নতুন করে কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। AP ও Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে—তাদের ওপর নতুন হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জ্বালানি অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এতে করে পরিস্থিতি দ্রুত আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী ঘটতে পারে। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বলছে, কয়েকটি সম্ভাবনা সামনে আছে। প্রথমত, ইরান যদি কোনোভাবে জাহাজ চলাচলে বাধা কমায় বা প্রণালিতে আংশিক স্বাভাবিকতা ফেরায়, তাহলে তাৎক্ষণিক সামরিক হামলা এড়ানো যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইরান যদি অনড় থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সীমিত বা প্রতীকী সামরিক হামলা চালাতে পারে—বিশেষত বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো বা সামরিক সক্ষমতাসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে। তৃতীয়ত, এই হুমকি বাস্তবায়নের আগেই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা, নৌ-নিরাপত্তা জোট বা কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। এগুলো সংবাদসূত্রের তথ্যভিত্তিক সম্ভাব্য বিশ্লেষণ; এখনও চূড়ান্ত কোনো পরবর্তী পদক্ষেপ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
এই সংকটের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। হরমুজে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ইতোমধ্যে চাপের মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এশিয়া, ইউরোপ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষ হওয়ার প্রাক্কালে বিশ্ব এখন নজর রাখছে হরমুজ প্রণালির দিকে। এটি কেবল একটি সামরিক বা কূটনৈতিক সংকট নয়; একইসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য প্রবাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ইরানের প্রতিক্রিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান—এই তিনটি বিষয়ই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।