
কুমিল্লায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হওয়ার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। শনিবার (২১ মার্চ) রাত ৩টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটার পর থেকে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি ঘটনাস্থলেই আটকে আছে। এতে চট্টগ্রাম রুটে রেল চলাচল সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে এবং যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর আখাউড়া থেকে একটি রিলিফ ট্রেন পাঠানো হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টার পর রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। তিনি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন করে রেল চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঈদের দিন সাধারণত এই মেইল ট্রেনটিই চলাচল করে। ঈদের পরদিন থেকে অন্যান্য ট্রেন স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল শুরু করে। তবে যেহেতু দুর্ঘটনাটি ঈদের রাতেই ঘটেছে, তাই তাৎক্ষণিকভাবে অন্য ট্রেনের বড় ধরনের শিডিউল বিপর্যয় তৈরি হয়নি। রেল কর্মকর্তাদের আশা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে শিডিউল অনুযায়ী ছেড়ে আসা ট্রেনগুলো কুমিল্লার দিকে পৌঁছানোর আগেই উদ্ধার কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা মামুন পরিবহনের একটি বাস লক্ষ্মীপুরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। পথে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং অতিক্রম করার সময় ঢাকাগামী বা ঢাকা থেকে আসা চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় বাসটির মাঝামাঝি অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই বাসের ১২ যাত্রীর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। হতাহতদের উদ্ধারে তাৎক্ষণিক তৎপরতা শুরু হয়। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কিনা, তা নিয়েও শঙ্কা ছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হয়েছেন।
এ দুর্ঘটনার ফলে শুধু প্রাণহানিই নয়, চট্টগ্রামের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগও বন্ধ হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামমুখী এবং চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। যদিও রেল বিভাগ বলছে, ঈদের বিশেষ সময়সূচির কারণে কিছুটা সময় হাতে থাকায় বড় ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা এড়ানো যেতে পারে।
রেল সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পদুয়ার বাজারের মতো ব্যস্ত রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ সড়ক ও রেলপথের সংযোগস্থলগুলোতে সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ঈদযাত্রার সময় যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সংঘর্ষের শব্দ ছিল অত্যন্ত বিকট এবং মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাসটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে নিহতদের উদ্ধার করতেও বেগ পেতে হয়। দুর্ঘটনার পর রেললাইন ফাঁকা করা, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সরানো এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ে বিভাগ জানিয়েছে, উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ার পর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হবে। রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত ব্যক্তি, সিগন্যাল ব্যবস্থা, বাসচালকের অবস্থান এবং ট্রেনের গতি—সব বিষয়ই তদন্তের আওতায় আসতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ঈদ আনন্দের দিনে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। স্বজনহারাদের আহাজারি, আহতদের আতঙ্ক এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি একটি বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। এখন সবার নজর উদ্ধার কাজ দ্রুত শেষ করে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করার দিকে, পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে।