
ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের চেষ্টা চালিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। শনিবার প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাত দিয়ে বলা হয়, ইরান ঘাঁটিটির দিকে দুটি মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। তবে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ব্যর্থ হয়। অন্য ক্ষেপণাস্ত্রটির বিরুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়। তবে সেটি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করতে পেরেছিল কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবু যুক্তরাজ্য-সংক্রান্ত সূত্রের মূল বক্তব্য হলো, হামলার চেষ্টা হলেও দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি।
এ ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়কাল। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য পরে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়, যাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালানো যায়। সেই সিদ্ধান্তে দিয়েগো গার্সিয়া ও আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের মতো ঘাঁটির কথাও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার চেষ্টা এমন এক উত্তেজনাকর প্রেক্ষাপটে ঘটে, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছিল।
যুক্তরাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যগুলোতেও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৭ মার্চ দেওয়া এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তেল রপ্তানি অবকাঠামো, গ্যাস স্থাপনা, বন্দর ও বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে বিধিনিষেধ দেখা দিয়েছে, যার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহরও জানিয়েছে যে দেশটি দিয়েগো গার্সিয়ার দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তবে তাদের উপস্থাপনায় এ ঘটনাকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমা সূত্রগুলো বলছে, হামলার চেষ্টা সফল হয়নি। ফলে ঘটনাটি নিয়ে উভয় পক্ষের ভাষ্য আলাদা হলেও, একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—দিয়েগো গার্সিয়া এই উত্তেজনার সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগরে অবস্থান হওয়ায় এটি মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক তৎপরতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এই ঘাঁটি লক্ষ্য করে কোনো হামলার চেষ্টা শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়; বরং তা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। এ কারণেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এ ধরনের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ঘटनাটির পর এখন প্রধান প্রশ্ন হলো, এই হামলা ভবিষ্যতে আরও বড় সামরিক পাল্টাপাল্টির দিকে নিয়ে যাবে কি না। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের আঞ্চলিক তৎপরতা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথে বাণিজ্য নিরাপত্তা এবং মিত্র ঘাঁটিগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। অর্থাৎ, দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের এই ব্যর্থ চেষ্টা বাস্তবে সফল না হলেও এর কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বড়।
সব মিলিয়ে, বর্তমান তথ্য অনুযায়ী বলা যায়—ইরান দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, কিন্তু তা লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি। ব্রিটিশ ও মার্কিন সূত্র হামলাকে ব্যর্থ বলছে, আর এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক উত্তেজনাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। পরবর্তী দিনগুলোতে এ ঘটনার কূটনৈতিক ও সামরিক প্রতিক্রিয়া কোন দিকে যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।