
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহ সংকটের প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি ও শোধন কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় থাকা বিপুল পরিমাণ ইরানি অপরিশোধিত তেল নতুন করে আন্তর্জাতিক বাজারের নজরে এসেছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে সমুদ্রে থাকা ইরানি তেলের একটি অংশ বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের এই ছাড় মূলত ২০ মার্চের মধ্যে সমুদ্রে থাকা এবং ১৯ এপ্রিলের মধ্যে খালাসযোগ্য তেলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর ফলে বহুদিন ধরে জাহাজে আটকে থাকা ইরানি তেল এশিয়ার আমদানিকারকদের জন্য একটি সম্ভাব্য বিকল্প সরবরাহ উৎস হিসেবে সামনে এসেছে।
তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চীনের জলসীমা পর্যন্ত বিভিন্ন ট্যাংকারে প্রায় ১৭ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে এনার্জি এসপেক্টস ১৯ মার্চের মূল্যায়নে এ পরিমাণ ১৩০ থেকে ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল বলে উল্লেখ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মজুদ বর্তমান সরবরাহ সংকটে বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদন ঘাটতির তুলনায় দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের বিকল্প জোগান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এশিয়ার জন্য এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অঞ্চলটি অপরিশোধিত তেলের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে টানা অস্থিরতা ও চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় অনেক শোধনাগার উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে শুধু জ্বালানি সরবরাহই কমছে না, বরং রপ্তানি, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারদর—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে চীন কার্যত ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতায় পরিণত হয়। কেপলারের তথ্যমতে, গত বছর চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছে। এই আমদানির বড় অংশ করেছে দেশটির স্বাধীন বা ‘টিপট’ শোধনাগারগুলো, যারা কম দামে তেল কিনে নিজেদের পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে চেয়েছে। একই সময়ে অনেক বড় রাষ্ট্রীয় ক্রেতা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে সরাসরি কেনাকাটা থেকে দূরে থেকেছে।
চীনের বাইরে, ভারতসহ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ আবারও ইরানি তেল কেনার সম্ভাবনা যাচাই করছে। অতীতে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি, গ্রিস, তাইওয়ান ও তুরস্ক ইরানি তেলের উল্লেখযোগ্য ক্রেতা ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ভারতের নাম সামনে এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের তেলের মজুদ তুলনামূলক কম থাকায় দেশটির কয়েকটি শোধনাগার ইরানি তেল আমদানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। যদিও তারা এখনো সরকারি নির্দেশনা, অর্থ পরিশোধের কাঠামো এবং ওয়াশিংটনের ছাড়ের শর্তাবলি নিয়ে আরও পরিষ্কার অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে ইরানি তেল আমদানির পথে জটিলতাও কম নয়। তেল ব্যবসায়ী ও শোধনাগার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—লেনদেন কীভাবে সম্পন্ন হবে। কারণ নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী সময়ে ইরানি তেলের বড় অংশ তৃতীয় পক্ষের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে এবং অনেক চালান বহন করেছে পুরোনো ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ট্যাংকার। ফলে বীমা, ব্যাংকিং, জাহাজের কাগজপত্র, উৎস শনাক্তকরণ এবং অর্থ পরিশোধ—সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এছাড়া আগের কিছু ক্রেতার সঙ্গে চুক্তিগত সম্পর্ক থাকলেও ২০১৮ সালের পর সেই স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
সব মিলিয়ে, সমুদ্রে ভাসমান বিপুল ইরানি তেল এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক ধরনের সাময়িক ‘বাফার’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তবে এই মজুদ বাজারে এলেও তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংকট, হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো গভীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি এমন এক সময়ের অস্থায়ী স্বস্তি, যখন এশিয়ার বড় আমদানিকারকরা দ্রুত বিকল্প জোগান নিশ্চিত করতে চাইছে এবং বিশ্ববাজার প্রতিটি নতুন ঘটনার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।