
ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) কমেন্ট্রি প্যানেল ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার ও দীর্ঘদিনের ধারাভাষ্যকার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণন। শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬-এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, বিসিসিআইয়ের হয়ে ধারাভাষ্য দেওয়া থেকে তিনি অবসর নিচ্ছেন। এই ঘোষণার সঙ্গে তিনি এমন অভিযোগও উত্থাপন করেছেন, যা ভারতীয় ক্রিকেটমহলে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। শিবরামকৃষ্ণনের দাবি, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাকে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন-এয়ার দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছে, এবং এর পেছনে “colour discrimination” বা বর্ণভিত্তিক বৈষম্য কাজ করে থাকতে পারে।
নিজের পোস্টে শিবরামকৃষ্ণন লেখেন, ২৩ বছর ধরে তাকে টস বা প্রেজেন্টেশনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এমনকি নতুনদেরও পিচ রিপোর্ট, টস এবং প্রেজেন্টেশনের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাকে বারবার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তার প্রশ্ন ছিল, “এর পেছনের কারণ কী হতে পারে বলে আপনাদের মনে হয়?” পরে এক ভক্তের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি “Colour discrimination” বলে ইঙ্গিত দেন। এই দুই পোস্টই মূল বিতর্ককে উসকে দেয় এবং দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
বিষয়টি সামনে আসার পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, শিবরামকৃষ্ণনের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কেবল একটি দায়িত্ব না পাওয়া নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি মনে করছেন, সম্প্রচারের দৃশ্যমান অংশে তাকে পরিকল্পিতভাবে কম ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ২৩ বছর ধরে নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেছেন এবং আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে এই পরিস্থিতি মেনে নিতে রাজি নন। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তার অবসর ঘোষণা তাৎক্ষণিক আবেগের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের হতাশা ও অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
শিবরামকৃষ্ণনের এই বিস্ফোরক অভিযোগের পর ইন্টারনেটে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদল ভক্ত ও পর্যবেক্ষক তার প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন এবং মনে করছেন, ভারতীয় ক্রিকেট সম্প্রচারে নির্দিষ্ট কয়েকজন মুখকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে আরেকটি অংশ তার অভিযোগের প্রমাণ ও ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কেউ কেউ বলছেন, সম্প্রচার দায়িত্ব বণ্টনের পেছনে দক্ষতা, ভাষা, উপস্থাপনা শৈলী, জনপ্রিয়তা এবং প্রযোজনা-সংক্রান্ত বিবেচনাও থাকতে পারে। ফলে ঘটনাটি এখন কেবল ব্যক্তিগত অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সম্প্রচারমাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব, ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
তবে এখন পর্যন্ত বিসিসিআই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দিয়েছে কি না, তা নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। অন্তত শুক্রবার রাত পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বোর্ডের পক্ষ থেকে বিশদ জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটি আপাতত একতরফা দাবি হিসেবেই আলোচিত হচ্ছে, যদিও বিষয়টি গণমাধ্যমে বড় পরিসরে জায়গা করে নিয়েছে।
লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণন ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে পরিচিত একটি নাম। ১৯৮০-এর দশকে তিনি ভারতের হয়ে ৯টি টেস্ট ও ১৬টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেন। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার ১২ উইকেট নেওয়া পারফরম্যান্স তাকে আলোচনায় এনে দেয়। এছাড়া ১৯৮৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত বেনসন অ্যান্ড হেজেস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব ক্রিকেটে ভারতের শিরোপা জয়ের পথেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষে তিনি দীর্ঘদিন বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
এই ঘটনার তাৎপর্য আরও বড় হয়ে ওঠে কারণ এটি এমন এক সময় সামনে এলো, যখন ভারতীয় ক্রিকেটে আইপিএল ২০২৬ শুরুর প্রাক্কালে সম্প্রচার, উপস্থাপনা এবং মিডিয়া কাঠামো নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। শিবরামকৃষ্ণনের অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, তার বক্তব্য সম্প্রচার প্যানেলে কাজের বণ্টন, দৃশ্যমান ভূমিকা নির্ধারণ এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। ক্রিকেটের মাঠের বাইরের এই বিতর্ক এখন কতদূর গড়ায়, এবং বিসিসিআই বা সম্প্রচার-সংশ্লিষ্ট মহল এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।