
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ Strait of Hormuz-এ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে বর্তমানে জাহাজ চলাচল প্রায় অচল অবস্থায় পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচল কমেছে প্রায় ৯৫ শতাংশ, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৮টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৫ থেকে ৬টিতে। চলতি মার্চ মাসে মোট ৯৯টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। আন্তর্জাতিক শিপিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার কারণেই অধিকাংশ জাহাজ এই পথ এড়িয়ে চলছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব মূলত জ্বালানি পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে থাকে। ফলে এখানে চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়া মানে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়া। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এখন তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে যেসব জাহাজ সীমিত আকারে চলাচল করছে, তার অনেকগুলোই ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ বিকল্প সমুদ্রপথ ব্যবহার করছে, যদিও সেই পথগুলো দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং সময়ও বেশি লাগছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক জাহাজ অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন খরচে, শিল্প উৎপাদনে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যমূল্যে। ফলে শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে।
এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক দেশ তাদের জ্বালানি আমদানির জন্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ ব্যাহত হলে শিল্প উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্বব্যাপী নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎস ও রুট খোঁজার চেষ্টা বাড়াতে পারে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়—এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।