
ইরান জাতীয় ফুটবল দল থেকে তারকা স্ট্রাইকার সরদার আজমুনকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা দেশজুড়ে এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬ প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের প্রতি “অবিশ্বস্ততা”র অভিযোগে আজমুনকে জাতীয় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে তার খেলার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে গেছে বলেই ধরা হচ্ছে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে—ইরান ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে ঘটনাটি নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্তের চেয়ে, নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত জোরালো রিপোর্ট হিসেবে উপস্থাপন করাই তথ্যগতভাবে বেশি সঠিক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতর্কের সূত্রপাত হয় চলতি সপ্তাহে আজমুনের একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টকে ঘিরে। সেখানে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের সঙ্গে সাক্ষাতের একটি ছবি পোস্ট করেন। রয়টার্স জানায়, এই পোস্ট ইরান সরকারের মহলে ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে। কারণ, এটি এমন এক সময়ে সামনে আসে যখন ইরান-সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পর্ক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় ছিল। বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়ার পর ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমন উত্তপ্ত বাস্তবতায় আজমুনের ওই ছবি রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ফারস নিউজ এজেন্সি জাতীয় দলের একটি “বিশ্বস্ত সূত্রের” বরাত দিয়ে জানায়, আজমুনকে স্কোয়াড থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যদিও এই তথ্য সরাসরি ফেডারেশন ঘোষণা হিসেবে আসেনি, তবুও ফারসের মতো প্রভাবশালী ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি দ্রুত গুরুত্ব পায়। পরে আল জাজিরাও একই তথ্য প্রকাশ করে জানায় যে, শাবাব আল-আহলি ক্লাবে খেলা এই তারকা ফুটবলারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে “disloyalty” বা আনুগত্যহীনতার অভিযোগ আনা হয়েছে। আজমুন পরবর্তীতে ইনস্টাগ্রাম থেকে ছবিটি মুছে ফেললেও বিতর্ক আর থামেনি।
বিতর্ককে আরও উসকে দেয় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আসা প্রতিক্রিয়া। রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটবল বিশ্লেষক মোহাম্মদ মিসাঘি আজমুনের কড়া সমালোচনা করে বলেন, তিনি সময় ও পরিস্থিতি বুঝে কীভাবে আচরণ করতে হয়, সেটুকুও বোঝেননি। তার ভাষ্যে, জাতীয় দলের জার্সি পরার জন্য একজন খেলোয়াড়ের শুধু ফুটবল দক্ষতা যথেষ্ট নয়; তাকে দেশ ও জাতীয় প্রতীকের প্রতি আনুগত্যও দেখাতে হয়। এই মন্তব্য দেখাচ্ছে যে, আজমুনের বিরুদ্ধে অভিযোগটি কেবল ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট নয়, বরং তা জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, তার দলচ্যুতির খবর ফুটবলীয় সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক সংকেত বহন করছে।
ফুটবলীয় দিক থেকে দেখলে, সরদার আজমুনের অনুপস্থিতি ইরানের জন্য বড় ধাক্কা হবে। তিনি ২০১৪ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক করেন এবং এরপর থেকে দলটির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ডদের একজন হয়ে ওঠেন। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের হয়ে ৯১ ম্যাচে ৫৭ গোল করেছেন তিনি, যা তাকে দেশটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার অবস্থানে রেখেছে। তিনি ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও ইরানের হয়ে খেলেছেন। ক্লাব পর্যায়ে বায়ার লেভারকুসেন, জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং রোমার মতো ইউরোপীয় ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বর্তমানে তিনি আরব আমিরাতের শাবাব আল-আহলিতে খেলছেন। এমন একজন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকারকে হারানো ইরানের আক্রমণভাগকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এখানে আরেকটি বড় প্রেক্ষাপট হলো ২০২৬ বিশ্বকাপ। রয়টার্সের সাম্প্রতিক আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বিশ্বকাপের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম নিয়েও ইরান অসন্তোষ দেখিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ ঘিরেই কিছু অনিশ্চয়তার কথা উঠে এসেছে। তার মধ্যে আবার সরদার আজমুনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফরোয়ার্ডকে ঘিরে এই বিতর্ক জাতীয় দলকে আরও অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। যদি ইরান শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে অংশ নেয়, তবে আজমুনের অনুপস্থিতি মাঠের খেলায় যেমন প্রভাব ফেলবে, তেমনি দলের সামগ্রিক মানসিক প্রস্তুতিতেও ছাপ ফেলতে পারে। তবে যতক্ষণ না ইরান ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে, ততক্ষণ এ ঘটনাকে “রিপোর্ট অনুযায়ী” বা “সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী” বলেই তুলে ধরা উচিত।
সব মিলিয়ে, সরদার আজমুনকে জাতীয় দল থেকে বাদ দেওয়ার খবর কেবল একটি খেলোয়াড়-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়; এটি বর্তমান ইরানের রাজনৈতিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রশ্নে ক্রীড়াজগতের ওপর চাপের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে, ইরান ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিকভাবে কী জানায়, এবং আজমুন নিজে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেন কি না। ততক্ষণ পর্যন্ত এটুকু বলা যায়—রিপোর্টগুলো সত্য হলে, এটি ইরান ফুটবলের জন্য যেমন বড় খবর, তেমনি ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে অন্যতম আলোচিত ক্রীড়া-রাজনৈতিক ঘটনাও বটে।