
ঈদুল ফিতরের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে ধারাবাহিক পতন দেখা যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারী ও ক্রেতা উভয়ের মধ্যেই নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির কারণে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) স্বর্ণের দাম এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বাজার তথ্য অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১.১ শতাংশ কমে ৪,৭৬৪.২৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি ৬ ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন মূল্য। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এপ্রিল ডেলিভারির স্বর্ণ ফিউচার্সের দাম ২.৬ শতাংশ কমে ৪,৭৭০ ডলারে নেমে এসেছে। এর আগের দিন বুধবারও কয়েক দফায় স্বর্ণের দামে পতন লক্ষ্য করা গেছে, যা বাজারে একটি ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দরপতনের মূল কারণ শক্তিশালী মার্কিন ডলার। যখন ডলারের মান বৃদ্ধি পায়, তখন অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ফলে স্বর্ণের চাহিদা কমে যায় এবং দাম নিম্নমুখী হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি করছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের কড়া মুদ্রানীতিও স্বর্ণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, ফেড নিকট ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর পথে হাঁটবে না। এতে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
স্বর্ণ সাধারণত বৈশ্বিক অস্থিরতা বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রচলিত প্রবণতায় ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পরও স্বর্ণের দাম বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। এই সময়ের মধ্যে স্বর্ণের দাম ৯ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে স্বর্ণের দাম আরও কমতে পারে। বিশেষ করে যদি ডলার আরও শক্তিশালী হয় এবং ফেডের কড়াকড়ি নীতি অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বর্ণের বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।
বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঈদের আগে সাধারণত স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়, বিশেষ করে গহনা কেনার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পতন স্থানীয় বাজারে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে স্বর্ণের বাজার অত্যন্ত অস্থির এবং নানা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সব মিলিয়ে, ঈদের আগে স্বর্ণের দামে এই ধারাবাহিক পতন একদিকে যেমন ক্রেতাদের জন্য ইতিবাচক খবর, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী স্বর্ণের বাজার কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।