
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী ও বৈষম্যহীন করার লক্ষ্যে সরকার ‘শিক্ষা আইন ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। শিক্ষাকে সুযোগ নয়, বরং নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। খসড়া আইনটি জনমতের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টার মধ্যে নির্ধারিত ই-মেইলে সাধারণ মানুষ তাদের মতামত পাঠাতে পারবেন। প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা শেষে খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।
প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনটি মোট ১১টি অধ্যায় ও ৫৫টি ধারায় বিন্যস্ত। এর অন্যতম আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোচিং সেন্টার এবং গাইড ও নোট বইয়ের কার্যক্রম ধাপে ধাপে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা। খসড়া আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এসব কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে সরকার অনুমোদিত সহায়ক পুস্তকের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।
আইনে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি, মানসিক নিপীড়ন, র্যাগিং এবং সাইবার বুলিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। খসড়ার ৩৯ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শারীরিক আঘাত বা মানসিক নির্যাতন করলে তা অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত আইনে শিক্ষার স্তর নির্ধারণ করে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক এবং ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনে প্রথমবারের মতো কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সমান গুরুত্ব দিয়ে ডিপ্লোমা পর্যায় পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করার কথা বলা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের ভূমিকা জোরদার, স্নাতক পর্যায়ে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি চালু এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসি নির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণে জাতীয় গবেষণা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় গবেষণাগার স্থাপনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক আইডি চালু, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় সরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক এবং ই-লার্নিং বিস্তারে একটি জাতীয় অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, এই আইন কার্যকর হলে তা বিদ্যমান অন্যান্য আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে এবং কোনো বিরোধ দেখা দিলে শিক্ষা আইন ২০২৬-ই কার্যকর হবে।