
ভোটের মাঠে প্রার্থীর নাম, প্রতীক ও স্লোগান থাকলেও ঘরের ভেতরের রাজনীতির দরজা খুলে দিচ্ছেন নারীরাই। বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারে এমন একটি চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার কাজে পুরুষদের বদলে সামনে থাকছেন নারী কর্মীরা—যাদের কেউ সাবেক শিক্ষক, কেউ গৃহিণী, আবার কেউ ধর্মীয় তালিম কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
স্থানীয়ভাবে দেখা গেছে, রান্নাঘর, উঠান কিংবা তালিমের আসরের মতো ব্যক্তিগত পরিসরই হয়ে উঠছে ভোটের প্রচারের ক্ষেত্র। পুরুষ কর্মীরা যেখানে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না, সেখানে নারী কর্মীরা সহজেই নারীদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং ভোটের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।
প্রচারে যুক্ত নারীরা নিজেরাই স্বীকার করছেন, তাদের প্রচারণা কেবল রাজনৈতিক নয়; এর ভিত্তি সামাজিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় বিশ্বাস। দরজায় কড়া নাড়ার পর পরিচয় আসে ধর্মীয় ভাষায়—একজন মুসলমান হিসেবে আরেকজন মুসলমানের কাছে ইসলামের পথে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এভাবে প্রচারণা চালানো নারীদের একজন মোসাম্মদ নাসিমা খানম। বাকেরগঞ্জ উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নাসিমা একসময় শিক্ষকতা করেছেন এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। গত পাঁচ মাস ধরে তিনি বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও মাদরাসার তালিম কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নারী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
নাসিমা খানম বলেন, তিনি নারী ভোটারদের বোঝান যে তারা কোরআনের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে ভোট চাইছেন। তার ভাষায়, কোরআনের আইন প্রতিষ্ঠা মানে কোরআনকে বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং সেই অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করা। তিনি দাবি করেন, অনেক নারী ভোটার এই কথার সঙ্গে একমত হচ্ছেন এবং মুসলমান হিসেবে মুসলমানের পক্ষে ভোট দেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন।
বোয়ালিয়া ইউনিয়নে নাসিমার সামাজিক অবস্থানও প্রচারণায় ভূমিকা রাখছে। এলাকায় কারও মৃত্যু হলে গোসল করানোর দায়িত্বও তিনি পালন করেন। এই সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতাই এখন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নাসিমার সঙ্গে আরও আট থেকে দশজন নারী দলবদ্ধভাবে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। তাদের বেশির ভাগই তালিম কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ সরাসরি জামায়াতের সংগঠনের সঙ্গে না থাকলেও সামাজিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের সূত্র ধরে প্রচারে যুক্ত হয়েছেন।
জামায়াতের নারী কর্মীরা দলগতভাবে প্রচার চালাচ্ছেন বলে জানান দাড়িয়াল ইউনিয়নের পাপড়ি আক্তার। তিনি বলেন, তারা ছয় থেকে দশজনের দলে মূলত নারী ভোটারদের কাছেই যাচ্ছেন।
সংখ্যালঘু ও অন্য ধর্মাবলম্বী নারীদের বিষয়ে নুরুনিসা সিদ্দিকা বলেন, জিহাদ কোরআনের পরিভাষা হলেও তা মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য। অমুসলিমদের ক্ষেত্রে দাওয়াত উপস্থাপন করা হয়। তার দাবি, তারাও এই প্রচারকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করছেন।
তবে ধর্মের নামে ভোট চাওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন বরিশাল-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। তার দাবি, জামায়াতের কর্মীরা ভোট চাইছেন নাগরিক অধিকার হিসেবে, কিন্তু জান্নাত বা বেহেশতের টিকিটের কথা বলে ভোট চাওয়ার অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, প্রার্থীরা নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় সতর্ক থাকেন। তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীরা যা বলেন, তা অনেক সময় ব্যক্তিগত উদ্যোগ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এতে দল উপকৃত হলেও সামাজিক ও ধর্মীয় দায়ভার মূলত নারীদের ওপরই পড়ে। তিনি বলেন, এই নারীরাই হয়ে উঠছেন রাজনৈতিক ব্যবস্থার নীরব ও অদৃশ্য কর্মী।