
ইসলামি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবানের মধ্যভাগের রজনী—শব-ই-বরাত—মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ সময়। এই রাতকে ঘিরে মুসলমানদের মধ্যে ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া ও আত্মসমালোচনার আবহ তৈরি হয়। ‘শব-ই-বরাত’ শব্দটি ফারসি; ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা অব্যাহতি। অর্থাৎ, এটি এমন এক রাত, যে রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের গুনাহ থেকে মুক্তি প্রদান করেন—এমন বিশ্বাস মুসলিম সমাজে প্রচলিত।
পবিত্র কুরআনে সরাসরি ‘শব-ই-বরাত’ শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও সূরা আদ-দুখানের ৩-৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—
“নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। সে রাতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।”(সূরা আদ-দুখান: ৩-৪)
তাফসিরকারদের একটি অংশ এই ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ বা বরকতময় রাতকে শাবানের মধ্যরাত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও অধিকাংশ মুফাসসির একে লাইলাতুল কদরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করেছেন, তবু শাবানের এই রাতের ফজিলত হাদিস দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত।
হাদিসে এ রাতের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে এসেছে। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
“এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে পেলাম না। খুঁজতে বের হয়ে দেখি তিনি জান্নাতুল বাকীতে অবস্থান করছেন। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শাবানের মধ্যরাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষের পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি লোককে ক্ষমা করে দেন।’”(তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, এ রাত আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের বিশেষ উপলক্ষ।
যদিও শব-ই-বরাত ক্ষমার রাত, তবু কিছু শ্রেণির মানুষ এ রাতে আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে বলে হাদিসে এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“আল্লাহ তাআলা শাবানের মধ্যরাতে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”(ইবনে মাজাহ)
অন্য বর্ণনায় আরও এসেছে—মদ্যপ, জাদুকর, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ও পিতা-মাতার অবাধ্য ব্যক্তিরাও এই রাতে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে।
এ থেকে স্পষ্ট হয়, শুধু ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা, সামাজিক সম্পর্কের সংশোধন ও শিরক থেকে মুক্ত থাকাই এ রাতের মূল শিক্ষা।
শব-ই-বরাত উপলক্ষে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফার করা নেক আমল। তবে এসব আমল হতে হবে সুন্নাহসম্মত ও বিদআত-মুক্ত।
নবী করিম (সা.) থেকে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ নামাজ বা নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাতের নির্দেশনা পাওয়া যায় না। তাই প্রচলিত ‘শবে বরাতের ১০০ রাকাত নামাজ’ বা বিশেষ পদ্ধতির নামাজের কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। ইসলাম নির্দেশ দেয়—নফল ইবাদত ব্যক্তিগতভাবে, নিভৃতে ও বিনয়ভরে পালন করতে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবানের মধ্যরাতে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে গিয়েছিলেন—এ কথা হাদিসে প্রমাণিত। তাই এ রাতে কবর জিয়ারত করা বৈধ ও নেক আমল, যদি তা শিরক বা কুসংস্কারমুক্ত হয়। কবরবাসীদের জন্য দোয়া করা, নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করা—এটাই কবর জিয়ারতের মূল উদ্দেশ্য।
দুঃখজনক হলেও সত্য, শব-ই-বরাতকে ঘিরে আমাদের সমাজে আতশবাজি, ফানুস ও অপচয়ের প্রবণতা দেখা যায়, যা ইসলামের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইসলাম কখনোই অপচয় ও অনর্থক আনন্দকে সমর্থন করে না।
এ রাত আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়—আমরা কি সত্যিই আল্লাহর ক্ষমা চাইছি, নাকি কেবল সামাজিক রেওয়াজ পালন করছি? আমাদের নামাজ, ব্যবসা, পারিবারিক আচরণ, সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছু কি ইসলামের আলোকে পরিচালিত?
শব-ই-বরাত মূলত তাকওয়া অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেকে চিন্তা করো, আগামী দিনের জন্য সে কী প্রেরণ করেছে।”(সূরা আল-হাশর: ১৮)
এই দিন শুধু আখিরাত নয়, বরং আমাদের পরবর্তী জীবনধারার দিকনির্দেশনাও বটে।
শব-ই-বরাত কোনো উৎসবের রাত নয়, বরং এটি আত্মজাগরণের রাত। এই রাতে মুসলিম উম্মাহর উচিত বিভেদ ভুলে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পরিহার করা, সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা। ক্ষমা কেবল আল্লাহর কাছে চাইলেই যথেষ্ট নয়—মানুষের হক আদায়, অন্যায়ের জন্য অনুশোচনা ও সংশোধনের দৃঢ় সংকল্পই শব-ই-বরাতের প্রকৃত শিক্ষা।
এই পবিত্র রজনী যেন আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা করে—এই প্রত্যাশাই হোক শব-ই-বরাতের মূল বার্তা।