
আর কদিন পরই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুম। এই সময়টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তবে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আসন্ন মাসগুলোতে তীব্র লোডশেডিংয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে রমজান ও গ্রীষ্ম মৌসুমে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে। এতে শিল্প, সেচ ও গৃহস্থালি পর্যায়ে ভোগান্তি বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরও তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। মার্চে তা বাড়বে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে, আর এপ্রিল ও মে মাসে চাহিদা পৌঁছাতে পারে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে।
এদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকঋণের সুদ ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, সামনে রমজান ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের ওপর চাপ বাড়বে—এ বিষয়টি মাথায় রেখেই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ছাড়া এই চাহিদা মোকাবেলা করা সম্ভব নয় এবং এপ্রিল-মে মাসে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পনা চলছে।
গ্যাস সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পেট্রোবাংলার সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ এখনো সীমিত।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত বলেন, রমজান ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বকেয়া বিল পরিশোধ না হলে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এতে জাতীয় বিদ্যুৎ নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিপিডিবি সূত্র জানায়, দেশে গ্রিডভিত্তিক মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে এর অর্ধেক উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাস সংকট সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশে গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না হলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।
এদিকে বিইআরসির সাম্প্রতিক গণশুনানিতে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বড় আর্থিক ঘাটতি কমাতে নির্বাচনের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে দাম পাইকারি না গ্রাহক পর্যায়ে বাড়বে—তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।