
জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশে সাইবার হামলার ঝুঁকি ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগের সময়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল। এই সময়ে ভোটার তথ্যভান্ডার, নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সরকারি ওয়েবসাইট, রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্ভাব্য হামলার প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।
বিশ্বের সাম্প্রতিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনকে ঘিরে সাইবার আক্রমণ এখন নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়েছে। ভোটের আগে ও ভোট চলাকালে ডি-ডস আক্রমণ, ভোটার ডেটা হ্যাকিং, সমন্বিত গুজব ছড়ানো, বট নেটওয়ার্কের ব্যবহার এবং ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করার ঘটনা ঘটছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশ আলাদা নয়।
ডি-ডস আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য সাধারণত কোনো সিস্টেম ধ্বংস করা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেটিকে অকার্যকর করে দেওয়া। বিপুলসংখ্যক বট বা সংক্রমিত ডিভাইস একযোগে সার্ভারে অনুরোধ পাঠিয়ে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট, ফলাফল প্রকাশের সার্ভার, সরকারি তথ্য পোর্টাল কিংবা গণমাধ্যমের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাময়িকভাবে অচল করে দেওয়া হয়। এতে তৈরি হয় তথ্যশূন্যতা, যার সুযোগ নিয়ে ছড়ানো হয় গুজব ও বিভ্রান্তি। ফলে ডি-ডস আক্রমণ এখন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ঘটনাও এই ঝুঁকির বাস্তবতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মলদোভা নির্বাচনের সময় দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন, সরকারি ক্লাউড সিস্টেম এবং প্রবাসী ভোটার-সংক্রান্ত ওয়েবসাইট একাধিক সাইবার ও ডি-ডস আক্রমণের শিকার হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডোরিন রেচিয়ান এসব ঘটনাকে ‘ব্যাপক সাইবার আক্রমণের অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সময় সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক অংশগ্রহণমূলক সাইটও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচন শুরুর সময়ে নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইট এবং সরকারি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ডি-ডস আক্রমণ চালানো হয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা এসব ঘটনাকে তথ্য পরিবেশে বিভ্রান্তি তৈরির কৌশল হিসেবে দেখেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে নির্বাচন কমিশনের ভোটার ডেটাবেস, ফলাফল সংগ্রহ ও প্রকাশের ডিজিটাল সিস্টেম, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যভাণ্ডার এবং গণমাধ্যমের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত গুজব, ভুয়া পোস্ট ও কৃত্রিম ভিডিও এখন বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট আক্রান্ত হওয়া দেখিয়েছে, সাইবার ঝুঁকি কেবল তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব ও তাৎক্ষণিকও। বিশ্লেষকদের মতে, এমন অ্যাকাউন্ট থেকে ভুয়া বক্তব্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো গেলে অল্প সময়েই রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করা সম্ভব।
এই ঘটনাগুলো আরও দেখিয়েছে, ডিজিটাল আক্রমণের ঝুঁকি শুধু রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাংবাদিক, আইনজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরাও ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতিবেদকের নিজের ফেসবুক আইডিতে সাম্প্রতিক হ্যাকিং চেষ্টার তথ্য সামনে আসায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে একাধিক সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়া, গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সেবায় বিঘ্ন এবং সংগঠিত ভুয়া তথ্য ছড়ানোর নজির রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নির্বাচনের সময় এসব আক্রমণ আরও সমন্বিত ও সংগঠিত রূপ নিতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের সময় সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক স্তরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিস্টেমগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আইটি শাখা বলছে, ভোটার তালিকা ও সার্ভারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্ত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিটগুলোও অনলাইন গুজব ও অপরাধ নজরদারিতে থাকবে।
তবে স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষিত প্রস্তুতি ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে এখনো ফাঁক রয়েছে। তাদের ভাষায়, সাইবার হামলা শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশও বটে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, সাইবার হামলার ঝুঁকি এখন বাস্তব। সরকার ও বিজিডি ই-গভ সিআইআরটি সতর্কতা জারি করেছে এবং প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
ওয়ান ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট কেএম মহিউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই সাইবার হামলার জন্য উচ্চ ঝুঁকির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ জনবলের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন এখন আর শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচন হচ্ছে অনলাইন টাইমলাইন, ট্রেন্ড ও স্ক্রিনে। প্রস্তুতি না থাকলে এই ডিজিটাল লড়াইয়ে ঝুঁকিতে থাকবে সবাই।