
দেশে বৈষম্যহীন, দারিদ্র্যমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে যাকাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান এবং যাকাত ফেয়ারের অর্গানাইজিং কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকা যাকাত সংগ্রহের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। এই অর্থ সঠিকভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে দারিদ্র্য বিমোচনে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) চতুর্দশ যাকাত ফেয়ার উপলক্ষে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেডএম) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের জনগণের মধ্যে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে যাকাত একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। সঠিকভাবে যাকাত প্রদান মানে শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়; বরং দারিদ্র্যপীড়িত মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা, যাতে তারা ভবিষ্যতে সমাজের দাতা হিসেবে দাঁড়াতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সরকারকে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ দেশে বিপুল পরিমাণ যাকাত আদায়ের সুযোগ রয়েছে। এই অর্থ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে গৃহহীনতা, চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু এবং চরম দারিদ্র্যের মতো সমস্যাগুলো অনেকটাই কমে আসবে।
যাকাত ব্যবস্থাপনার প্রচলিত ধারা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশে এখনও ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাকাত আদায় বেশি হয় এবং শাড়ি-লুঙ্গী বিতরণের প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এতে সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন আসে না। এর পরিবর্তে কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ—যেমন ভ্যানগাড়ি, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা উৎপাদনমূলক সহায়তা দিলে সমাজে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব।
সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, চলতি বছরে সিজেডএমের যাকাত সংগ্রহের লক্ষ্য ৯০ কোটি টাকা। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি মেধাবিকাশে বিশেষভাবে কাজ করে আসছে। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের সাড়ে ১৭ হাজার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীকে ৩০ মাস মেয়াদি ‘জিনিয়াস’ উচ্চ বৃত্তি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরও ৫০০ শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছে।
তিনি আরও জানান, সিজেডএম সারা দেশে ৬০টির বেশি প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ সরবরাহ করছে। এছাড়া ডায়ালাইসিস সেন্টারে প্রতি মাসে ৬০ জন রোগী বিনামূল্যে সেবা পাচ্ছেন এবং ৩০ জন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষকে ভোকেশনাল ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ‘ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় যাকাত’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আগামী শনিবার (৩১ জানুয়ারি) রাজধানীর বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাবে চতুর্দশ যাকাত ফেয়ার ২০২৬ অনুষ্ঠিত হবে। ফেয়ারের উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন।
যাকাত ফেয়ারে তিনটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে শুরু হবে ‘Islamic Social Finance: A Roadmap for the Way Forward’ শীর্ষক সিম্পোজিয়াম। বেলা আড়াইটায় নারীদের জন্য প্রশ্নোত্তর সেশন এবং একই সময়ে অন্য হলে চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানসমূহের অভিজ্ঞতা বিনিময় সেশন অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত যাকাত ক্যালকুলেশন ডেস্কে যাকাত হিসাব ও মাসআলা-মাসায়েল সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া হবে।