
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কথা বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি একটি গভীর দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে টাইম ম্যাগাজিন।
গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তারেক রহমান। বিমানবন্দরে হাজারো নেতাকর্মী ও সমর্থকের উপস্থিতিতে তাকে স্বাগত জানানো হয়। দেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও আবেগঘন করে তোলে। সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, মায়ের কাছ থেকে তিনি শিখেছেন—দায়িত্ব পেলে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
প্রায় দেড় বছর আগে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ছাত্র–জনতার আন্দোলন, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দমন–পীড়নের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম বড় নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি একটি প্রধান শক্তি হিসেবে মাঠে নামছে এবং তারেক রহমান কার্যত দলটির প্রধান মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ধারার উত্তরাধিকার বহন করেন, একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকেও গুরুত্ব দেন। তার বক্তব্যে বারবার দায়িত্ব, ঐক্য এবং রাজনৈতিক অধিকার শব্দগুলো গুরুত্ব পায়।
দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার মানের অবনতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের প্রভাব শিল্প ও জ্বালানি খাতে পড়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকটকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেন।
তারেক রহমান পরিবেশ, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে খাল–নদী পুনরুদ্ধার, বৃক্ষরোপণ, ঢাকায় সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার চাপ কমাতে বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব। তিনি বলেন, এসব পরিকল্পনার আংশিক বাস্তবায়ন হলেও দেশের অর্থনীতি ও জীবনমান দৃশ্যমানভাবে উন্নত হবে।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে তার প্রথম অগ্রাধিকার। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত দিকও উঠে আসে। সমর্থকদের মতে, তিনি রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার; সমালোচকদের মতে, অতীতে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তারেক রহমান এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন এবং জানান, বিভিন্ন মামলায় দেওয়া দণ্ডাদেশ পরে বাতিল হয়েছে।
২০০৭–২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাবন্দী থাকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, কারাগারে নির্যাতনের ফলে তার মেরুদণ্ডে স্থায়ী সমস্যা তৈরি হয়। তবে তিনি এটিকে জনগণের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার স্মারক হিসেবে দেখেন এবং ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে লক্ষ্যেই কাজ করার অঙ্গীকার করেন।