
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে চরম তাপমাত্রায় আক্রান্ত ছয়টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ স্থান পাবে—এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে এক আন্তর্জাতিক গবেষণায়। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘নেচার সাসটেইনেবিলিটি’-তে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানির বর্তমান ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে চরম তাপে আক্রান্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যার হার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, তাহলে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ—অর্থাৎ প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ—অসহনীয় তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করবে।
গবেষকরা তাপপ্রবাহের ঝুঁকি নিরূপণে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ (Cooling Degree Days–CDD) নামে একটি সূচক ব্যবহার করেছেন। বছরে ৩ হাজারের বেশি সিডিডি থাকা অঞ্চলগুলোকে ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সূচক মূলত নিরাপদ তাপমাত্রা বজায় রাখতে কতটা শীতলীকরণের প্রয়োজন হয়, তা নির্দেশ করে।
এই মানদণ্ড অনুযায়ী, চরম তাপে বসবাসকারী সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. জেসুস লিজানা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের জাতীয় গড় তাপমাত্রা প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা পুরোপুরি তুলে ধরে না। কারণ দেশের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই বিপজ্জনক তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে বাংলাদেশে হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ এবং কিডনি সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী—যাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থা বা এয়ার কন্ডিশনের মতো সুবিধায় প্রবেশাধিকার সীমিত।
এতদিন বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান হুমকি হিসেবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়কে গুরুত্ব দেওয়া হলেও, এখন চরম তাপমাত্রা একটি নীরব কিন্তু সমানভাবে প্রাণঘাতী বিপদ হিসেবে সামনে আসছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, গরম বাড়ার ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা দ্রুত বাড়বে, যা এক ধরনের ‘কুলিং ট্র্যাপ’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ বেশি এয়ার কন্ডিশনের ব্যবহার যদি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হয়, তবে তা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
গবেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তাহলে প্রাণঘাতী তাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে সেই সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ‘অত্যন্ত শীতল’ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের হার বর্তমানের ১৪ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নেমে আসবে। বিপরীতে ব্রাজিল, লাওস ও দক্ষিণ সুদানের মতো দেশে মাথাপিছু শীতলীকরণের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।