
বর্ষাকাল এলেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে নতুন করে দেখা দেয় পাহাড়ধসের শঙ্কা। কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল এবং ভূমিধসের ঘটনায় দেশের সাতটি জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি জেলাগুলো, যেখানে পাহাড়ধসের পাশাপাশি আকস্মিক বন্যাও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসে চট্টগ্রামে একদিনেই ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ। আবহাওয়াবিদদের মতে, এ বছর মৌসুমি নিম্নচাপ উপকূল ঘেঁষে অগ্রসর হওয়ায় পাহাড়ি এলাকায় বিপুল পরিমাণ আর্দ্রতা জমা হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ধস কেবল একদিনের বৃষ্টির কারণে ঘটে না। কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মাটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মাধ্যাকর্ষণের টানে মাটির স্তর ভেঙে নিচে নেমে আসে। তবে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক কারণ নয়, মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক বনভূমি ধ্বংস হওয়ায় পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় কম বৃষ্টিতেই এখন ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে।
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো মূলত বালুময় ও ক্ষয়প্রবণ। এসব পাহাড়ে অতিরিক্ত পানি জমে গেলে মাটির ওজন বেড়ে যায় এবং সহজেই ধসে পড়ে। এ কারণেই চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঝুঁকি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রাণহানির অধিকাংশই রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার। অতীতেও এই অঞ্চল ভয়াবহ পাহাড়ধসের সাক্ষী হয়েছে। ২০০৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন এবং ২০১৭ সালে ১৬০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এরপরও বিভিন্ন সময়ে প্রাণঘাতী ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। পাহাড়ের মাটি এখনো ভেজা থাকায় নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে আরও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় চিহ্নিত করা, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধ করা, পাহাড়ঘেঁষা বসতি সরিয়ে নেওয়া এবং আগাম সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
তাদের মতে, শুধু দুর্যোগের সময় উদ্ধার অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই চট্টগ্রামে প্রতি বর্ষায় ফিরে আসা পাহাড়ধসের এই ভয়াবহ চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।