
ভারতের মহাকাশ গবেষণা ও বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ খাতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে দেশটির বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্কাইরুট অ্যারোস্পেস। শনিবার অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীহরিকোটায় অবস্থিত সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে ভারতের প্রথম বেসরকারি কক্ষপথগামী রকেট ‘বিক্রম-১’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফল উৎক্ষেপণ শুধু একটি প্রযুক্তিগত অর্জন নয়, বরং ভারতের দ্রুত বিকাশমান বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণ বাজারে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
‘মিশন আগমন’ নামে পরিচালিত এই অভিযানে বিক্রম-১ সফলভাবে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (Low Earth Orbit) পৌঁছে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় বহন করা সব পেলোড নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করে। উৎক্ষেপণের পর স্কাইরুট অ্যারোস্পেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, রকেটটির শেষ ধাপের জ্বালানি পোড়ানোর কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে এবং সব প্রযুক্তিগত লক্ষ্য সফলভাবে অর্জিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই সাফল্যের মাধ্যমে ভারত বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে বেসরকারি উদ্যোগে কক্ষপথে রকেট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জন করেছে। যদিও উৎক্ষেপণের নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে নিরাপত্তাজনিত কারণে কাউন্টডাউন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল, পরে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে সফলভাবে রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়।
উৎক্ষেপণের সময় মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পবন কুমার চান্দানা ও নাগা ভারত ডাকা। তারা দুজনই ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর সাবেক বিজ্ঞানী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইসরোর চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন, সংস্থাটির সাবেক কর্মকর্তারা, ভারতীয় মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা এবং অন্ধ্র প্রদেশের মন্ত্রী নারা লোকেশ।
সফল উৎক্ষেপণের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের প্রতিষ্ঠাতাদের ফোন করে অভিনন্দন জানান বলে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে। স্কাইরুট অ্যারোস্পেস এক্সে লিখেছে, “বিক্রম-১ সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছেছে। ভারতের বেসরকারি মহাকাশ কর্মসূচির জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন।”
এই অভিযানে রকেটটি গ্রাহা স্পেস, কসমোসার্ভ স্পেস, ডিসিকিউবড এবং স্কাইরুটের নিজস্ব প্রযুক্তি প্রদর্শনের পরীক্ষামূলক পেলোড বহন করেছে। পাশাপাশি ভারতের বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার অগ্রদূতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে লেখা ‘বন্দে মাতরম’ পোস্টকার্ড, ১৮ ক্যারেট সোনার তৈরি ক্ষুদ্র রকেট এবং বিক্রম সারাভাই, সি. ভি. রমন ও এপিজে আবদুল কালামের ক্ষুদ্র ভাস্কর্যও মহাকাশে পাঠানো হয়েছে।
স্কাইরুট অ্যারোস্পেস জানিয়েছে, এই মিশন থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে রকেটের নেভিগেশন, দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা, ৩ডি প্রিন্টেড ইঞ্জিন এবং কার্বন কম্পোজিট কাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণকে আরও নির্ভরযোগ্য ও উন্নত করতে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে স্কাইরুট অ্যারোস্পেস ‘বিক্রম-এস’ নামে একটি সাবঅরবিটাল রকেট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছিল। তবে বিক্রম-১-ই প্রতিষ্ঠানটির প্রথম রকেট, যা সফলভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে পেলোড স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এই অর্জন ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।