
সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক চাপ কমাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্র জানায়, মূল্যস্ফীতির প্রভাবে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই ঋণ ও ধার-দেনার চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন, যার প্রভাব পড়ছে কর্মক্ষেত্রেও। রেশন সুবিধা চালু হলে তাদের আর্থিক চাপ কিছুটা লাঘব হবে এবং দাপ্তরিক কাজে মনোযোগ ও কর্মদক্ষতা বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মতি ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। গত জুন মাসে অর্থ বিভাগের সচিবকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। একই সঙ্গে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিন মাস পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিবদের নিয়ে বৈঠকে বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ মে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে প্রথম এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় রেশন সুবিধা চালু করলে তাদের আর্থিক চাপ কমবে এবং দায়িত্ব পালনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে। বাস্তবায়নের সময়সীমা স্বল্প, মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি হবে কি না, সে বিষয়ে অর্থ বিভাগ নিয়মিতভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানাবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন অধিশাখার উপ-সচিব মো. মামুন জানিয়েছেন, ডিসি সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তবে এ সুবিধা কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছতা, সঠিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাবকে অনেক সময় দুর্নীতির অজুহাত হিসেবে তুলে ধরা হয়। রেশন সুবিধা চালু হলে সেই চাপও কিছুটা কমতে পারে। তবে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে ১২তম গ্রেডে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, হিসাব সহকারী, ক্যাশিয়ার, ডাটা এন্ট্রি সুপারভাইজার, অডিটর, গুদামরক্ষক, নিরাপত্তা পরিদর্শক এবং জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টরের মতো পদ রয়েছে। অন্যদিকে ২০তম গ্রেডে অফিস সহায়ক, পিয়ন, নিরাপত্তা প্রহরী, মালী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো পদ অন্তর্ভুক্ত।
এখন পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, কারা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, এনএসআই, এসএসএফ, দুদক এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ মোট ১০টি প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা সরকারি রেশন সুবিধা ভোগ করছেন। উদাহরণ হিসেবে, পুলিশ সদস্যদের চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য মাসিক ২০ কেজি চাল, ২০ কেজি আটা, ২ কেজি ডাল, সাড়ে ৪ লিটার সয়াবিন তেল এবং ২ কেজি চিনি বরাদ্দ রয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ১২ থেকে ২০ গ্রেডের বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে এটি সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।