
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড ঘোষণা করেছে, এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী সব তেলবাহী জাহাজকে ইরানের নির্ধারিত ও অনুমোদিত নৌপথ ব্যবহার করতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ঘোষণায় বলা হয়, খাতাম আল-আম্বিয়া যৌথ সামরিক কমান্ড এই নির্দেশনা জারি করেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হওয়ায় ইরানের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই ঘোষণার এক দিন আগে কাতারে মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিকদের মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে আলোচনার মধ্যেই ইরানের নতুন সতর্কবার্তা দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ইরানের সামরিক কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনুমোদিত নৌপথ থেকে সরে যাওয়া, নৌচলাচল সংক্রান্ত নির্দেশনা অমান্য করা কিংবা ইরানের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করলে সশস্ত্র বাহিনী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। এতে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করলে তারও দ্রুত ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এর আগে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের ফি ছাড়া জাহাজ চলাচলের বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। তবে তেহরান স্পষ্ট করে জানায়, কোন পথে জাহাজ চলবে—সে সিদ্ধান্ত তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে এবং পরবর্তীতে সেই পথ ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করা হবে। এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি আরব দেশ।
এদিকে ওমান এবং জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি সংস্থা ওমান উপকূলের কাছে বিকল্প নৌপথ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগও অঞ্চলটির ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
উত্তেজনার মধ্যেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে এই জলপথ দিয়ে অন্তত ২৫৮টি জাহাজ চলাচল করেছে। আগের সপ্তাহে এই সংখ্যা ছিল ১৩৮টি। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ নিয়মিত এই রুট ব্যবহার করত।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মিড বলেন, সাম্প্রতিক হামলার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। জাহাজ পরিচালনাকারীদের এখন ইরানের শর্ত মেনে চলা অথবা ওমানের দিকের বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করার মধ্যে একটি বেছে নিতে হচ্ছে। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে অনেক সময় ঘণ্টায় ঘণ্টায় জাহাজের রুট পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
এদিকে উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। বুধবারের বৈঠকে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি। তিনি বলেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী দফার আলোচনা আয়োজনের চেষ্টা চলছে।