
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত প্রভাব নিয়ে আবারও সরব হয়েছেন বিশ্বখ্যাত পপসম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা। সম্প্রতি ফ্যাশন সাময়িকী ভোগ ইতালিয়া-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি শিল্প, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সংস্কৃতি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
সাক্ষাৎকারে ম্যাডোনা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিল্প সৃষ্টির মৌলিক চেতনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তার মতে, এআই এমন একটি প্রবণতা, যা শিল্পকর্ম তৈরির প্রকৃত প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি মনে করেন, সত্যিকারের শিল্প সৃষ্টি হয় মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীল ঝুঁকি নেওয়ার মাধ্যমে; প্রযুক্তিনির্ভর শর্টকাটের মাধ্যমে নয়।
ম্যাডোনার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে অনেক শিল্পীর মনোযোগ শিল্পচর্চার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানোর দিকে চলে গেছে। আগে যেখানে শিল্পীরা একত্র হয়ে একে অপরের কাছ থেকে শিখতেন, অনুপ্রেরণা নিতেন এবং যৌথভাবে সৃষ্টিশীল কাজ করতেন, এখন সেখানে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে ফলোয়ার সংখ্যা, অ্যালগরিদম এবং ডিজিটাল উপস্থিতি।
নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন কোনো শিল্পীর সাফল্য নির্ধারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ভূমিকা ছিল না। শিল্পের মান, সৃজনশীলতা এবং কাজের গুণগত দিকই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই রেকর্ড ডিল বা নতুন কাজের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন শিল্পীর প্রতিভার চেয়ে তার অনলাইন জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংখ্যা-নির্ভর এই সংস্কৃতির সমালোচনা করতে গিয়ে ম্যাডোনা নিজের ‘Bring Your Love’ গানের একটি লাইনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সেই গানেও তিনি বার্তা দিয়েছিলেন—সংখ্যা দিয়ে যেন কাউকে বিভ্রান্ত করা না হয়। তার মতে, শিল্পকে পরিমাপ করার জন্য শুধুমাত্র সংখ্যা কখনোই যথেষ্ট নয়।
তিনি আরও বলেন, অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয়। অথচ নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যর্থতা এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। প্রযুক্তি যদি সেই জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে শিল্পের স্বকীয়তা ও মৌলিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নতুন গান তৈরির অনুপ্রেরণা সম্পর্কে ম্যাডোনা জানান, সৃজনশীল কাজের সময় তিনি সচেতনভাবেই প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। তার বিশ্বাস, নিরিবিলি পরিবেশ, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং নিজের সঙ্গে সময় কাটানোই নতুন ভাবনার জন্ম দেয়।
সম্প্রতি ব্যক্তিগত ও পেশাগত নানা ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে সময় পার করলেও তিনি নিয়মিত বিরতি নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটান এবং প্রকৃতির মাঝে নিজেকে খুঁজে নেন। তার মতে, কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হলে মানসিক স্থিরতা এবং প্রযুক্তি থেকে কিছুটা দূরে থাকা জরুরি।
প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ম্যাডোনা এবারই প্রথম কথা বললেন না। এর আগেও ‘Confessions To – The Film’-এর প্রিমিয়ারে আয়োজিত এক প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা করেছিলেন। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ও সম্পর্ককে ব্যাহত করছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিছু সময়ের জন্য হলেও মোবাইল ফোন সরিয়ে রেখে বাস্তব জীবনের মানুষদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তুলতে। তার মতে, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করলেও সেটির অতিরিক্ত ব্যবহার সৃজনশীলতা, সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।