
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম. এ. মুহিত বলেছেন, বিরোধীদল প্রায়ই সংস্কার এবং জুলাই সনদের কথা বললেও তারা কেবল সেই সংস্কারের বিষয়েই আলোচনা করে, যা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদারিত্ব বাড়াতে পারে। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে তারা কখনো সংসদে বা জনপরিসরে কার্যকর আলোচনা করেনি।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৭তম কার্যদিবসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
বাজেটের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময়ের নানা সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং শিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণআন্দোলনের পর গঠিত বর্তমান সংসদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই সীমিত সম্পদের মধ্যেও মানুষের চাহিদা পূরণে সরকার কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডা. এম. এ. মুহিত বলেন, স্বাস্থ্যখাতের বাজেটকে কেন্দ্র করেই তিনি আলোচনা করতে চান এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদেরও স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব সমস্যা ও সমাধান নিয়ে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা না করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করাই সময়ের দাবি।
তিনি জানান, এবারের স্বাস্থ্য বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা এবং এমন একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চিকিৎসাসেবা পাবেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, গত অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এবার সেই বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এই বিনিয়োগের উদ্দেশ্য শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ নয়; বরং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য কমানো এবং দক্ষ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে তোলাও এই বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য কমাতে এবং সমাজে স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ডা. মুহিত বলেন, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগ মানুষের মৃত্যুর বড় কারণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক মহামারি, দ্রুত নগরায়ণ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও স্বাস্থ্যখাতের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়। তুলনামূলকভাবে থাইল্যান্ডে এ হার মাত্র ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ। ভবিষ্যতে জনগণের ওপর চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমিয়ে আরও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে বিরোধীরা কখনো বিস্তারিত আলোচনা করেনি। অথচ স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মানবসম্পদ বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার।