
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর পৃথক দুটি অভিযানে আটজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) এ তথ্য জানায়। খবরটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।
আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৫ ও ২৬ জুন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খারান ও মাসতুং জেলায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বেলুচিস্তানে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে এই অভিযান চালানো হয় বলে জানানো হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দাবি, এসব গোষ্ঠী বিদেশি মদতপুষ্ট এবং দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
বিবৃতিতে বলা হয়, খারান জেলায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অবস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালানো হয়। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিনজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়। অভিযানের সময় আরও কয়েকজন আহত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর মতে, ওই এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা গোপনে অবস্থান করছিল এবং হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
অন্যদিকে, মাসতুং জেলায় সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলাকারীদের উপস্থিতির তথ্যের ভিত্তিতে আরেকটি অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে এক আত্মঘাতী হামলাকারীসহ পাঁচজন নিহত হয়। আইএসপিআর জানিয়েছে, অভিযানের সময় নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, যার ফলে বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
উভয় অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, ঘরে তৈরি বিস্ফোরক এবং ব্যবহৃত মোটরসাইকেল। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দাবি, এসব সামগ্রী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। উদ্ধারকৃত আলামত থেকে বোঝা যায়, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে নিরাপত্তা সংকট বিরাজ করছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রদেশটির স্বায়ত্তশাসন, সম্পদ বণ্টন এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়ে আসছে। এর ফলে প্রদেশটিতে প্রায়ই হামলা, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
পাকিস্তান সরকার বেলুচিস্তানভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে উল্লেখ করতে ‘ফিতনা আল হিন্দুস্তান’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। সরকারের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী ভারতের সমর্থন পাচ্ছে এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভারত বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। নয়াদিল্লির দাবি, পাকিস্তান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ তুলছে।
সাম্প্রতিক অভিযানের পর খারান ও মাসতুং জেলাজুড়ে সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ধরতে তল্লাশি অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখতে অতিরিক্ত চেকপোস্ট ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী বলেছে, বিদেশি মদতপুষ্ট সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী মনে করছে, বেলুচিস্তানে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং স্থানীয় সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানে এ ধরনের অভিযান সাময়িকভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করলেও, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সংলাপ, উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন জরুরি। কারণ, শুধু সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে প্রদেশটির জটিল সংকট পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, খারান ও মাসতুংয়ে চালানো এই অভিযান পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি বেলুচিস্তানে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানেরও স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।