
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে সংঘটিত মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে এক মুহূর্তে ভেঙে গেছে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন। এই ঘটনায় মা ও তিন বোনকে হারিয়ে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছেন ১৮ বছর বয়সী কলেজছাত্র জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। সাত বছর আগে বাবাকে হারানোর পর মা ও তিন বোনই ছিলেন তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। এখন সেই আশ্রয়ও হারিয়ে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সিফাতের বাবা কামাল হোসেন জীবিকার তাগিদে হকারি করতেন। সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি। ২০১৯ সালে ব্যবসার কাজে বের হয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার মৃত্যু হয়। এরপর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মা শাহীনুর বেগমের ওপর।
বাবার মৃত্যুর পরও পরিবারটি নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থী সিফাত পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন, যাতে পরিবারের ব্যয় নির্বাহে সহযোগিতা করতে পারেন। স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় সাত থেকে আট মাস ধরে কাজ করছিলেন তিনি।
কিন্তু বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে ঘটে যায় মর্মান্তিক সেই ঘটনা। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সিফাতের মা শাহীনুর বেগম (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২১), মেজো বোন ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট বোন শিফা আক্তার (৯) নিহত হন। ঘটনার পর স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) মারা যান।
এই হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তকারীরা বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছেন এবং ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন।
পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও সিফাতের বন্ধু ওমর ফারুক রনি জানান, চার ভাইবোনই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। তাদের বাবা-মা অনেক কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করেছিলেন। এমন একটি পরিবারের ওপর এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
মা ও বোনদের হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিফাত বলেন, “আমার মা, বোনদের কী অপরাধ ছিল? কেন তাদের এভাবে হত্যা করা হলো? আমি এখন কাদের নিয়ে বাঁচব? এই পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই।”
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সিফাত স্থানীয় একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন এবং পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিবারের এমন করুণ পরিণতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনার পর লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি প্রত্যক্ষদর্শী, বাড়ির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার একসময় একই এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন। কয়েক মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে গেলেও পূর্বপরিচয়ের সূত্রে ঘটনাস্থলে আসেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশের তথ্যমতে, একজন প্রতিবেশী অভিযুক্তকে বাড়ির সামনে দেখে তার উপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে তিনি পানির পাইপ মেরামতের কথা বলেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ওই প্রতিবেশী সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং স্থানীয়দের খবর দেন। তদন্ত শেষে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট সব তথ্য উদ্ঘাটনের আশা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।