
ঢাকার আদালতে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনার জন্ম দিয়েছে ২৯ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলা। মামলার মূল আসামির পরিবর্তে অন্য একজন নারী আত্মসমর্পণ করে জামিন নেওয়ার চেষ্টা করলে বিচারকের সন্দেহের জেরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে ওই নারীকে আদালতের হেফাজতে নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে ঢাকার যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ-৪ আদালতে এ ঘটনা ঘটে। বিচারক তানিয়া সুলতানা লিপির আদালতে মামলার মূল আসামি নাসরিন শিকদারের পরিবর্তে মনোয়ারা বেগম নামে এক নারী আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন।
শুনানিকালে আদালতের বিচারকের কাছে আসামির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। পরে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আত্মসমর্পণ করতে আসা নারী প্রকৃত আসামি নন। এ অবস্থায় বিচারক তাকে তাৎক্ষণিকভাবে এজলাসে আটকের নির্দেশ দেন এবং আদালতের হেফাজতে রাখার আদেশ দেন।
আদালতের পেশকার ইব্রাহীম খলিল অপু জানান, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নাসরিন শিকদারের পরিবর্তে মনোয়ারা বেগম আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ ও জামিন আবেদন করেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. কামরুজ্জামান সুমন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর। প্রক্সি হিসেবে হাজির হওয়া নারীকে আদালতের হেফাজতে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল আসামি, প্রক্সি হিসেবে হাজির হওয়া ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আটক মনোয়ারা বেগম বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও আইনজীবীদের চেম্বারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। অভিযোগ রয়েছে, মূল আসামির আইনজীবী তাকে আদালতে নিয়ে আসেন এবং আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বলেন। তবে বিষয়টি বিচারকের নজরে আসার পর ওই আইনজীবী আদালত এলাকা ত্যাগ করেন বলে জানা গেছে।
এজলাসে আটকের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন মনোয়ারা বেগম। তিনি দাবি করেন, তিনি পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক আইনজীবীর নির্দেশেই তিনি আদালতে এসেছিলেন এবং এটি যে আইনগতভাবে অপরাধ, তা তিনি বুঝতে পারেননি।
তিনি আদালতের কাছে নিজের নির্দোষতার দাবি জানিয়ে বলেন, জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। তার দুই সন্তান রয়েছে এবং তিনি কোনো প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন বলে দাবি করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ নিবেদিতা আহমেদ তুলি নামের এক নারী নাসরিন শিকদারের বিরুদ্ধে ২৯ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, পারিবারিক সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন সময়ে ফ্ল্যাট কেনার উদ্দেশ্যে আসামিকে মোট ২৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ওই অর্থের বিপরীতে নাসরিন শিকদার একটি ব্যাংক চেক প্রদান করেন। কিন্তু চেকটি ব্যাংকে জমা দিলে ‘অপর্যাপ্ত তহবিল’ দেখিয়ে তা ফেরত দেওয়া হয়। এরপর নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইন, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
ঘটনার পর আদালত অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিচার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতে প্রক্সি আসামি হাজির হওয়ার ঘটনা বিচার ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।