
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায় কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা জৈব সারের মান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের বৃক্ষরোপণ ও কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা সারের বস্তা খুলে কৃষকরা সেখানে পলিথিন, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যসদৃশ উপাদান দেখতে পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। ঘটনাটি স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চত্বরে বুধবার চারা ও জৈব সার বিতরণ কার্যক্রম চলাকালে কয়েকজন কৃষক প্রকাশ্যে এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, সরকারি সহায়তা হিসেবে যে জৈব সার দেওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে এমন উপাদান দেওয়া হয়েছে যা কৃষিজমিতে ব্যবহার উপযোগী নয়। ফলে অনেক কৃষক সার গ্রহণ না করে শুধু চারা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় উপজেলার ২০০ জন কৃষক ও ১০০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, ঔষধি ও বনজ গাছের চারা বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি চারার পরিচর্যার জন্য ৩০ কেজি করে জৈব সার দেওয়ারও বিধান রয়েছে।
বিতরণকেন্দ্রে উপস্থিত কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, সারের বস্তা খুলতেই তারা এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক, পলিথিন এবং ময়লা-আবর্জনা দেখতে পান। তাদের মতে, এই উপাদানগুলো কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত নয় এবং জমির জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে।
কৃষকদের একজন জানান, সরকারি সহায়তার প্রতি আস্থা রেখেই তারা সার নিতে এসেছিলেন। কিন্তু বিতরণকৃত সারের মান দেখে হতাশ হয়েছেন। আরেক কৃষক বলেন, অতীতে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে যে জৈব সার বিতরণ করা হয়েছে তার মান তুলনামূলক ভালো ছিল, তবে এবার পাওয়া উপকরণ প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঘটনাটি শুধু কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কয়েকজন মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাও সরবরাহকৃত সারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মতে, বিতরণকৃত কিছু বস্তায় থাকা উপাদান কৃষিকাজের জন্য কাঙ্ক্ষিত মান পূরণ করে না। একই সঙ্গে চারার সঙ্গে সরবরাহ করা কিছু উপকরণের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও কঠোর নজরদারি এবং সরবরাহ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাদের মতে, কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত উপকরণ যথাযথ মান বজায় রেখে সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রতন চন্দ্র বর্মণ জানান, যেসব বস্তায় নিম্নমানের বা অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদান পাওয়া গেছে, সেগুলো আলাদা করা হয়েছে। কৃষকদের মানসম্মত সার বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত সার ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কামারখন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপাশা হোসাইন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হয়েছে। সরবরাহকারীকে দ্রুত মানসম্মত জৈব সার সরবরাহ করে পুনরায় বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় হাজারো কৃষকের মধ্যে জৈব সার ও চারা বিতরণ করা হচ্ছে। কামারখন্দে পাওয়া অভিযোগের পর সরবরাহকারীকে সার পরিবর্তন করে নতুন করে সরবরাহ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা কার্যক্রমে উপকরণের মান যাচাই ও তদারকি আরও জোরদার করা হবে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীরা নির্ধারিত মানের সেবা ও সহায়তা পেতে পারেন।