
মশাবাহিত প্রাণঘাতী রোগ ডেঙ্গুর দ্রুত বিস্তার ঠেকাতে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শ্রীলঙ্কা সরকার। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হবে। এই ইউনিটের প্রধান কাজ হবে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা এবং দ্রুত সেগুলো ধ্বংস করা, যাতে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই সংখ্যা ২০১৭ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতির তুলনায় কম, তবুও বর্তমান প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, তখন প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার মানুষ আক্রান্ত হন এবং ৪৪০ জনের মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার দ্রুত ঘটে, যা সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। তাই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে আরও জানানো হয়েছে, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের জায়গায় মশার প্রজননের সুযোগ করে দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া সারা দেশে একযোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বুধবার থেকে কার্যকর হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আগেই সতর্ক করে জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। উষ্ণতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং নগরায়ণের ফলে ডেঙ্গুর বিস্তারের ঝুঁকি বেড়েছে। শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতিও এই বৈশ্বিক প্রবণতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জুন মাসের শুরু থেকেই দেশটিতে ডেঙ্গু সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে একদিনেই এক হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
শ্রীলঙ্কার জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের প্রধান কাপিলা কান্নাঙ্গারা সতর্ক করে বলেছেন, সংক্রমণ এভাবে বাড়তে থাকলে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে পারে। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালগুলো ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাই সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, সাধারণ জনগণের সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং মশা প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগের বিস্তার অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কার এই কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য।