
কুমিল্লা নগরীতে ড্রেনে পড়ে স্মৃতি নামের আট বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু জনমনে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ উঠেছে, সিটি করপোরেশনের দায়িত্বহীনতা এবং অবহেলার কারণেই এই নির্মম দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে ঘটনার পর কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) কেবল দুঃখ প্রকাশ করেই দায় সারছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সোমবার কুসিক প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু এ ঘটনাকে ‘হৃদয়বিদারক’ উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, নগরীর অরক্ষিত ড্রেনগুলো দ্রুত ঢেকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং শিশুটির পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে। তবে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, রবিবার রাতে ভারি বর্ষণের কারণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ওই সময় নগরীর ছোটরা এলাকার মফিজাবাদ কলোনিতে স্মৃতির নানার বাড়িতে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে রাতে মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল স্মৃতি।
জলাবদ্ধতার কারণে কোনো যানবাহন না পেয়ে তারা হেঁটেই রওনা দেন। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ করে স্মৃতি মায়ের হাত থেকে ছিটকে পাশের ড্রেনের ভাঙা স্ল্যাবের ফাঁক দিয়ে নিচে পড়ে যায়। পানিতে ঢেকে থাকা ড্রেনটি তখন কার্যত অদৃশ্য হয়ে ছিল, ফলে কেউ বুঝতেই পারেনি যে সেটি একটি মারাত্মক ঝুঁকির জায়গা।
মায়ের চিৎকারে আশপাশের মানুষ ছুটে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন জানান, ড্রেনে পড়ার পর প্রবল পানির স্রোতে শিশুটিকে কিছুটা দূরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। প্রায় ১৫ মিনিটের চেষ্টার পর ড্রেনের ভেতরে আটকে থাকা অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই এলাকায় ড্রেন পরিষ্কার কাজ চলছিল এবং কয়েকটি জায়গায় ড্রেনের স্ল্যাব খোলা বা ভাঙা অবস্থায় পড়ে ছিল। টানা বৃষ্টির কারণে সেগুলো পানির নিচে ঢেকে যায় এবং পুরো এলাকা একটি ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়। যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা।
এদিকে কুসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সায়েম ভূঁইয়া ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, যেখানে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে মূলত স্ল্যাব ছিল, তবে স্থানীয় কিছু লোক ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য সেটি সরিয়ে রেখেছিল। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত এই দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি শিশুটির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং জানাজায় অংশ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, নগরীর বেশ কিছু ড্রেনে ভাঙা স্ল্যাব রয়েছে এবং সেগুলো মেরামতের জন্য একটি প্রকল্প চলমান। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি আগে থেকেই কেন সমাধান করা হয়নি।
শিশুটির বাবা বিল্লাল হোসেন শোকে ভেঙে পড়ে বলেন, ‘ড্রেনের স্ল্যাব খোলা রাখার কারণেই আমার মেয়েটা মারা গেল। আমি কার কাছে বিচার চাইব? আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।’ তার এই বক্তব্যই পুরো ঘটনার মানবিক দিকটি আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার জানান, এটি একটি দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং এ কারণে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়নি।
এই মর্মান্তিক ঘটনা নগর ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নগরীর অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নজরদারির অভাব এ ধরনের দুর্ঘটনার মূল কারণ। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এমন আরও ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, স্মৃতির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি বড় ক্ষতি। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবেই ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।