
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য ও প্রযুক্তি-সংক্রান্ত উত্তেজনা আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। এবার যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের পাল্টা জবাবে চীন ১০টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত প্রতিরক্ষা এবং বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) খাতের সঙ্গে জড়িত।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ওয়াশিংটন ৮০টি চীনা কোম্পানি ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে, যাদের বিরুদ্ধে চীনের সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়। সেই তালিকায় আলিবাবা, বাইদু এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডির মতো বড় প্রতিষ্ঠানও ছিল।
এই ঘটনার এক মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দুই দেশ শুল্ক কমানোর বিষয়ে কিছু অগ্রগতি দেখালেও প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে বিরোধ কমেনি, বরং নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
চীনের নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ১০টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অ্যাভক্স, ওশকোশ ডিফেন্স, এমপি মেটেরিয়ালস এবং ইউএসএ রেয়ার আর্থসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি। এসব প্রতিষ্ঠান সামরিক সরঞ্জাম, বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং বিরল খনিজ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।
চীন জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে এখন থেকে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (সিভিল ও মিলিটারি উভয় কাজে ব্যবহৃত) পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি চলমান সব ধরনের রপ্তানি কার্যক্রমও অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু চীনা কোম্পানির ক্ষেত্রেই নয়, বরং অন্য দেশ বা অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যদি তারা নিষিদ্ধ কোম্পানিগুলোর কাছে চীনা প্রযুক্তি বা পণ্য সরবরাহ করে।
একই সময়ে চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় ৪৬টি মার্কিন প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি কোম্পানিকে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন, বোয়িংয়ের প্রতিরক্ষা বিভাগ, জেনারেল ডাইনামিক্স এবং অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় সামরিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।
তবে চীন জানিয়েছে, তাদের দেশে কার্যরত মার্কিন বিনিয়োগ থাকা কিছু কোম্পানি এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। নতুন এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু বাণিজ্যিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আরও গভীর রূপ। বিশেষ করে রেয়ার আর্থ খাত এই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, কারণ আধুনিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স এবং সামরিক শিল্পে এই খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া তাইওয়ান ইস্যু নিয়েও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির নিরাপত্তায় সমর্থন দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য বড় অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদনের বিষয়েও আলোচনা চালাচ্ছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান এই পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং রেয়ার আর্থ সরবরাহ চেইনে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।