
ইংলিশ চ্যানেলে রাশিয়ার একটি নিষিদ্ধ তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে ব্রিটিশ নৌবাহিনী। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত এই জাহাজটি রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ‘ভূতুড়ে জাহাজ’ নেটওয়ার্কের অংশ বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ।
আটক জাহাজটির নাম MV Smirnoz। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ২০২৫ সালেই নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত হয় এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে গোপনে রুশ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
গত ১৪ জুন ইংলিশ চ্যানেলে অভিযান চালিয়ে জাহাজটি আটক করা হয়। এরপর জাহাজের ক্যাপ্টেন, ভারতীয় নাগরিক অজয় পান্থকেও গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। তিনি ভারতের উত্তরাখণ্ডের নৈনিতাল এলাকার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক শিপিং সেক্টরে কাজ করছেন।
ব্রিটিশ আদালতে ১৬ জুন তাকে হাজির করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিষিদ্ধ রুশ তেল পরিবহনে জড়িত ছিলেন এবং ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তাদের জলসীমায় প্রবেশ করেছেন। আদালতে প্রসিকিউশন দাবি করেছে, এটি সরাসরি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের একটি গুরুতর ঘটনা।
অন্যদিকে ক্যাপ্টেনের পক্ষে আইনজীবী জেমস ডায়মন্ড যুক্তি দেন যে, অজয় পান্থ একজন কর্মচারী হিসেবে জাহাজ পরিচালনা করেছেন মাত্র। তার হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল না। মালিকপক্ষের নির্দেশ পালন করেই তিনি কাজ করেছেন। আইনজীবীর দাবি, এই ধরনের ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেনকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক নয়।
ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ এই ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নেটওয়ার্ককে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি বড় মাধ্যম হিসেবে দেখছে। অভিযোগ রয়েছে, রাশিয়া এসব পুরোনো বা পতাকাবিহীন জাহাজ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়ার এমন শত শত জাহাজ বিশ্বব্যাপী সক্রিয় রয়েছে, যেগুলো নিষেধাজ্ঞা এড়াতে নানা ধরনের কৌশল ব্যবহার করে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, এই নেটওয়ার্ক ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আটক ক্যাপ্টেন অজয় পান্থের পরিবার ভারতের সরকারের কাছে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। তার স্ত্রী ঋতু পান্থ বলেন, তার স্বামী ১৫ বছর ধরে সমুদ্রপথে কাজ করছেন এবং কখনো কোনো অভিযোগে জড়াননি। তিনি শুধু নির্দেশ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন।
ভারতের উত্তরাখণ্ড প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং ভারতীয় নাগরিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ব্রিটেনে ভারতীয় হাইকমিশনকে বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় জাহাজে থাকা আরও ২৪ জন নাবিকও রয়েছেন, যাদের মধ্যে ভারত ও জর্জিয়ার নাগরিক রয়েছে। তাদের অবস্থাও এখন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি জাহাজ আটকের বিষয় নয়; বরং এটি রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিপিং শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।