
দীর্ঘদিন ধরে চলা গণবিক্ষোভ ও অবরোধের চাপে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ শনিবার (২০ জুন) টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
গত ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বলিভিয়াজুড়ে শ্রমিক, কৃষক, খনি শ্রমিক ও বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে ব্যাপক আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারীরা মূলত সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই সহিংস ও অচলাবস্থার দিকে গড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বলিভিয়া বর্তমানে গত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ একটি নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ওই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে দেশটির প্রধান শ্রমিক সংগঠন ‘বলিভিয়ান ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল’ (সিওবি) আন্দোলন শুরু করে।
দীর্ঘ অচলাবস্থার পর সরকার এবং সিওবি’র মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী সরকার কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। এরপর সিওবি আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। তবে সব শ্রমিক গোষ্ঠী এই চুক্তিকে সমর্থন করেনি।
বিশেষ করে সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চাপারে অঞ্চলের শ্রমিক ও কোকা চাষিরা চুক্তিকে “বিশ্বাসঘাতকতা” বলে অভিহিত করে। তারা চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন ও অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে দেশের অন্তত ৫০টি স্থানে অবরোধ অব্যাহত রয়েছে।
এই অবরোধের কারণে রাজধানী লা পাজসহ প্রধান শহরগুলোতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। জ্বালানি, খাদ্য এবং জরুরি ওষুধের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীকে রাস্তায় নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যারা অবরোধ চালিয়ে যাবে বা সহিংসতায় জড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাত্র সাত মাস আগে মধ্য-ডানপন্থী নেতা রদ্রিগো পাজ ক্ষমতায় আসেন। তার নির্বাচনের মাধ্যমে বলিভিয়ায় দুই দশক ধরে চলা সমাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে। তবে ক্ষমতায় আসার পরপরই তার অর্থনৈতিক সংস্কারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
সরকারের অভিযোগ, এই আন্দোলনের পেছনে মাদক-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং আত্মগোপনে থাকা সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের সমর্থকদের হাত রয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছে, সরকারের নীতি জনগণের স্বার্থবিরোধী এবং অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বলিভিয়া কার্যত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিক কোন পথে যাবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।