
দেশে অনলাইন ও অফলাইন জুয়া, বেটিং এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন (অনলাইন/অফলাইন) ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং সম্প্রতি নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের পুরোনো জুয়া আইন বাতিল হয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় নতুন আইনি কাঠামো চালু হবে।
খসড়া আইনে অনলাইন বেটিং, রিমোট গ্যাম্বলিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত জুয়ার কার্যক্রমকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওয়েবসাইট, অ্যাপস বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে জুয়া প্রচার, পরিচালনা কিংবা সহায়তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সরকারের মতে, বর্তমানে প্রচলিত ১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং আইন ডিজিটাল যুগের জটিল অপরাধ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত নয়। অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পরিচালিত জুয়ার বিস্তার নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে অর্থপাচার, প্রতারণা এবং আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগও যুক্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খসড়া আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশে অবস্থান করে পরিচালিত জুয়া কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা। যদি কোনো বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে জুয়া বা বেটিং পরিচালনা করে, তাহলে সেই কার্যক্রমও এই আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আইনে ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য পৃথক শাস্তির প্রস্তাব রয়েছে। কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে আর্থিক লেনদেন বা সুবিধা আদান-প্রদান করলে তা ম্যাচ ফিক্সিং হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে খেলার নির্দিষ্ট কোনো মুহূর্ত বা ঘটনাকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ বা প্রদান করলে তা স্পট ফিক্সিংয়ের আওতায় পড়বে। এসব অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত আইনের কিছু ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে Human Rights Forum Bangladesh। সংগঠনটির মতে, খসড়ার ৩৯(১) ও ৩৯(২) ধারায় কেবল ‘বিশ্বাস’ বা ‘সন্দেহের’ ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশ, তথ্য সংগ্রহ, তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যা নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে।
এইচআরএফবির বক্তব্য অনুযায়ী, এমন ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদন, স্বাধীন নজরদারি এবং জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সংগঠনটি মনে করে, ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিজিটাল গোপনীয়তা সম্পর্কিত যেকোনো ব্যবস্থা অবশ্যই সংবিধানসম্মত এবং মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া খসড়া আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জন্য প্রস্তাবিত কিছু ক্ষমতাও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নাগরিক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া ও বেটিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আধুনিক আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। তবে আইন কার্যকর করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।