
দুবাইয়ে আটক সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ-কে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৪৪ পৃষ্ঠার মামলার নথিপত্রসহ প্রয়োজনীয় সব আইনি দলিল সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা ও সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, দুবাইয়ে আটকের পরপরই দ্রুততার সঙ্গে এ নথিপত্র পাঠানো হয়েছে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরত আনা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী।
তিনি আরও জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে দেশে মোট ছয়টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে এবং বাকিগুলো তদন্তাধীন। সরকার আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএ) প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও দুই দেশের মধ্যে আইনি সহযোগিতার মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, এবারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও সক্রিয় ও সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ইন্টারপোল-এর রেড নোটিশের ভিত্তিতে ১২ জুন দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে আটক করা হয়। এরপর একদিন পর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংসদেও জানানো হয়। একই দিন প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত নথি সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হয় বলে নিশ্চিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশটির আদালত সব নথি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগও থাকবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর পাশাপাশি তার সম্পদ জব্দ সংক্রান্ত তথ্যও সামনে এসেছে। আদালতের নির্দেশে তার ৬২১ বিঘা জমি ও খামার, গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং গোপালগঞ্জের একটি রিসোর্ট সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তার সম্পদের অনুসন্ধান ও জব্দ কার্যক্রম চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তার দুটি বিলাসবহুল বাড়ি ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিনিয়োগ অবরুদ্ধ করার তথ্যও সামনে এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তিনি মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন এবং এলাকাটিকে ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনার কথা জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রত্যর্পণ উদ্যোগ বাংলাদেশের আইন প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগবে, কারণ এটি সংশ্লিষ্ট দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার সব নথি ও প্রমাণ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সহজ হয়। এখন বিষয়টি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিচারিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
সব মিলিয়ে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার এই কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ এখন দেশ-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।