
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টার অবকাঠামোর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকতে চায় না ভারতও। দেশটি কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ টানতে এবং নিজেকে বৈশ্বিক ডিজিটাল হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে রাজ্য পর্যায়ে বড় ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
তবে নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষ করে তীব্র তাপমাত্রা।
‘২০২৬ গ্লোবাল অ্যানালাইসিস অফ প্ল্যানড ডেটা সেন্টার্স’ শীর্ষক এই গবেষণা পরিচালনা করেছে জলবায়ু ঝুঁকিবিষয়ক পরামর্শক সংস্থা ক্রস ডিপেন্ডেন্সি ইনিশিয়েটিভ (XDI)। প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী ২,৫৯৫টি পরিকল্পিত ডেটা সেন্টার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে প্রত্যক্ষ জলবায়ু ক্ষতি, তাপমাত্রাজনিত অপারেশনাল ব্যাঘাত এবং বিদ্যুৎ-পানি-পরিবহনসহ সহায়ক অবকাঠামোর ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভারত বর্তমানে পরিকল্পিত ডেটা সেন্টারগুলোর জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় বৈশ্বিক তালিকায় ১১তম অবস্থানে রয়েছে। দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটক সবচেয়ে এগিয়ে থাকলেও, এই রাজ্যগুলোই আবার তীব্র তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকির দিক থেকেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে।
বিশেষ করে গরম আবহাওয়ার কারণে ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে প্রতিবেদনে। শুধু ভারতের নয়, ব্রাজিল, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া ও স্পেনের মতো দেশগুলোও একই ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে, যেখানে পরিকল্পিত স্থাপনাগুলোর ৭৫ শতাংশেরও বেশি উচ্চ তাপমাত্রাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডেটা সেন্টারগুলো মূলত সার্ভার, ক্লাউড স্টোরেজ এবং এআই প্রসেসিংয়ের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী কম্পিউটিং সিস্টেম পরিচালনা করে। এসব সিস্টেম প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন কুলিং সিস্টেম প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাইরের পরিবেশ যদি অতিরিক্ত গরম হয়, তাহলে কুলিং সিস্টেমের ওপর চাপ বেড়ে যায়, বিদ্যুৎ খরচ বৃদ্ধি পায় এবং সার্ভিস ব্যাঘাতের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
এছাড়া শুধু অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো নয়, ডেটা সেন্টারগুলো নির্ভরশীল থাকে বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি সরবরাহ, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং পরিবহন ব্যবস্থার ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব বাহ্যিক ব্যবস্থায়ও বিঘ্ন ঘটলে পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেম বিপর্যস্ত হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ধরনের পরোক্ষ ঝুঁকি অনেক সময় সরাসরি ক্ষতির চেয়েও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপীয় একটি মডেলের তথ্য অনুযায়ী, পরোক্ষ জলবায়ুজনিত ক্ষতি প্রত্যক্ষ ক্ষতির তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে।
এক্সডিআই-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. কার্ল ম্যালন বলেন, এখন শুধু বিদ্যুৎ বা পানির প্রাপ্যতা নয়, বরং জলবায়ু ঝুঁকিও ডেটা সেন্টার পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতের ডিজিটাল অবকাঠামো শুধু নির্মাণ করলেই হবে না, বরং তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, বীমাযোগ্য এবং কার্যক্ষম থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিং খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো না গড়ে তুললে এই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দ্রুত নির্মাণের চাপে মান নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষিত হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে আশাবাদও প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা, উপযুক্ত স্থান নির্বাচন এবং আধুনিক প্রকৌশল ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। জলবায়ু-সহনশীল ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে ভারত ভবিষ্যতে এআই অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।